মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও রাসুল (সা.)-এর প্রতি অটল ভালোবাসার নজির গড়া সাহাবি খুবাঈব (রা.)
ইসলামিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য ডেস্ক: মদিনার ঐতিহ্যবাহী আউস গোত্রের বানু জাহজাবা শাখায় জন্ম নেওয়া সাহাবি হজরত খুবাঈব ইবনে আদী (রা.) ছিলেন শান্ত, ধীরস্থির এবং অসীম সাহসী এক বীর। ইসলামের সূচনালগ্নেই তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাতে হাত রেখে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেন।
ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে তিনি বীরত্বের সাথে লড়াই করে মক্কার কুরাইশ নেতা হারিস ইবনে আমেরকে হত্যা করেছিলেন। পরবর্তীতে হিজরি তৃতীয় বা চতুর্থ সালে রাসুলুল্লাহ (সা.) আসিম ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে ১০ জনের এক দাওয়াতি ও গোয়েন্দা সাহাবি দলকে পাঠালে ‘রাজী’ নামক স্থানে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন তাঁরা। অধিকাংশ সাহাবি শাহাদাত বরণ করলেও খুবাঈব (রা.)-কে বন্দি করে মক্কায় নিয়ে বদরের প্রতিশোধ হিসেবে হারিসের পরিবারের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
হারিসের কন্যার বর্ণনায় ফুটে ওঠে খুবাঈব (রা.)-এর বন্দিজীবনের অতুলনীয় চরিত্র ও অলৌকিক ঘটনার বিবরণ:
- শত্রুর সন্তানের প্রতি অকৃত্রিম মমতা: একদিন নিজের পরিচ্ছন্নতার জন্য ধারালো ক্ষুর চেয়ে নেওয়ার পর, খেলার ছলে হারিসের অবুঝ নাতি খুবাঈব (রা.)-এর কোলে গিয়ে বসে। শিশুর পরিবার ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়লে খুবাঈব (রা.) মুচকি হেসে বলেন, “তুমি কি ভয় পাচ্ছ যে আমি এই বাচ্চাটিকে হত্যা করব? কক্ষনো নয়। এমন বিশ্বাসঘাতকতা বা নিষ্ঠুরতা আমরা করি না।” (সহিহ বুখারি: ৩৯৮৯)
- গাইবি রিজিক: লোহার শেকলে বন্দি থাকা অবস্থায় শীতকালে মক্কায় যখন কোনো আঙুরের অস্তিত্ব ছিল না, তখনো তাঁর হাতে সুস্বাদু ও তাজা আঙুরের থোকা দেখা যেত, যা ছিল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো বিশেষ রিজিক।
মক্কার কুরাইশরা হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁকে হারাম শরিফের বাইরে ‘তানঈম’ নামক স্থানে নিয়ে গেলে, তিনি শাহাদাতের পূর্বে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের অনুমতি চান। অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে নামাজ শেষে তিনি ঘাতকদের উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক কথা বলেন:
“আল্লাহর কসম! তোমরা যদি মনে না করতে যে আমি মৃত্যুর ভয়ে নামাজ দীর্ঘ করছি, তবে আমি আমার রবের দরবারে আরও কিছুক্ষণ সিজদায় পড়ে থাকতাম।” (সহিহ বুখারি: ৩৯৮৯)
মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান তাঁকে জিজ্ঞেস করে— তিনি কি চান না তাঁর জায়গায় মুহাম্মদ (সা.)-কে এনে তাঁকে মুক্ত করে দেওয়া হোক?
উত্তরে বীর সাহাবি গর্জে উঠে বলেন:
“আল্লাহর কসম! আমি আমার পরিবার-পরিজনের কাছে নিরাপদে থাকার বিনিময়ে মদিনায় রাসুল (সা.)-এর পায়ে একটি ছোট্ট কাঁটা বিদ্ধ হোক— এটাও সহ্য করতে পারব না!” (সিরাত ইবনে হিশাম)
এই উত্তর শুনে স্তব্ধ আবু সুফিয়ান স্বীকার করতে বাধ্য হন, “মুহাম্মদের সঙ্গীরা তাকে যতটা ভালোবাসে, আমি পৃথিবীতে কাউকে এমন ভালোবাসতে দেখিনি।”
ঘাতকদের অস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি পঠিত কালজয়ী কবিতা ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্যে পাড়ি জমান:
“আমি যখন মুসলিম হিসেবে শহীদ হচ্ছি, তখন আমার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই যে, আল্লাহর পথে আমাকে আজ কোন পাশে লুটিয়ে পড়তে হবে। এই সবই তো আল্লাহর জন্য! তিনি চাইলে আমার এই খণ্ডিত দেহের প্রতিটি টুকরোতেও বরকত দিতে পারেন।” (সহিহ বুখারি: ৩৯৮৯)
হাসিমুখে বর্শা ও তলোয়ারের আঘাত সহ্য করে ইসলামের ইতিহাসে প্রথম শূলে চড়ে শহীদ হওয়া এবং মৃত্যুর পূর্বে দুই রাকাত নামাজের সুন্নাত চালু করা এই সাহাবির অবিচল ইমানি জীবন যুগে যুগে বিশ্বাসীদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
(তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, সিরাত ইবনে হিশাম ও আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া)



