সমাজতন্ত্রেই মুক্তি, শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক

নিজস্ব প্রতিবেদক: শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজতন্ত্রের সংগ্রামকে আরও বেগবান করার আহ্বান জানিয়েছেন বাসদ (বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল) কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন। গতকাল (১০ নভেম্বর ২০২৫) বিকেলে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে অনুষ্ঠিত বাসদ-এর ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও মহান সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ১০৮তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত জনসভায় তিনি এই আহ্বান জানান।
বাসদ রংপুর জেলার সংগ্রামী আহ্বায়ক কমরেড আব্দুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় প্রধান বক্তা ছিলেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের অন্যতম শীর্ষনেতা কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন বাসদ রংপুর জেলা সদস্য সচিব মমিনুল ইসলাম, মিঠাপুকুর উপজেলা সমন্বয়ক আতিয়ার রহমান, কৃষকফ্রন্ট জেলা সাধারণ সম্পাদক অমল সরকার, ছাত্রফ্রন্ট মহানগর সভাপতি যুগেশ ত্রিপুরা এবং শ্রমিক ফ্রন্ট সংগঠক মাজেদুল ইসলাম দুলাল প্রমুখ।
কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন তার বক্তব্যে বলেন, ব্রিটিশ-পরবর্তী প্রায় ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এদেশের মানুষ যখনই শোষণ-বৈষম্যের শিকার হয়েছে, তখনই তারা সংগ্রাম করেছে। এর ফলস্বরূপ সৃষ্টি হয়েছে একাত্তর ও নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান। জনগণের প্রত্যাশা ছিল একটি শোষণ-বৈষম্যমুক্ত মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে। কিন্তু তিনি জোর দিয়ে বলেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে তা কখনোই সম্ভব নয়। ফলস্বরূপ, গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো হওয়ার বদলে ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে।

তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গত ১৫ মাসে বহু শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়েছে, বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের অনেকেই কাজ হারিয়ে দেশে ফিরেছেন। এর ফলে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে, দরিদ্র আরও দরিদ্র হয়েছে এবং ভাসমান মানুষের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকার তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রসহ সকল নদ-নদী সুরক্ষা না করে দেশের বন্দর বিদেশিদের ইজারা দেওয়ার বন্দোবস্ত করছে, যা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীকে দেশে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও চরম অবনতি ঘটেছে।
শ্রমসহ কিছু সংস্কার কমিশন গঠিত হলেও তাদের কোনো প্রস্তাবই এখনও গৃহীত হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল প্রতিটি কমিশনের সুপারিশ জনগণকে জানানো, কিন্তু তা করা হয়নি এবং সরকার কী করতে চায়, তাও স্পষ্ট নয়। তিনি মনে করেন, এভাবে জনগণের দুর্দশা লাঘব হবে না।
কমরেড রতন বলেন, আজ থেকে ১০৮ বছর পূর্বে সোভিয়েত রাশিয়া সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে দেখিয়েছিল যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কীভাবে শোষণ-বৈষম্য নিরসন করে একটি মানবিক সমাজ গঠন করা সম্ভব। সেই বিপ্লবের প্রেরণা থেকেই ১৯৮০ সালে বাসদ আত্মপ্রকাশ করে এবং আজ দলটি তার ৪৫ বছরে পদার্পণ করছে। প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে বাসদ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়, জাতীয় সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষা এবং শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ধারাবাহিক আন্দোলন করে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সৃষ্টি এবং জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই প্রকৃত মুক্তি আসবে। তিনি দেশের আপামর জনগণকে বাসদসহ বাম গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে কমরেড আব্দুল কুদ্দুস বলেন, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চল দেশের কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও কৃষক প্রতিবারই ঠকছেন। সার, বীজ, সেচ, কীটনাশকের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লেও ভরা মৌসুমে তারা সেই খরচও তুলতে পারছেন না। শহরে ভাসমান ও ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। একমাত্র চিনিকল শ্যামপুর সুগার মিল বন্ধ রয়েছে। তিনি জানান, শুধুমাত্র সিটি কর্পোরেশন এলাকাতেই ১৪ থেকে ২০ হাজার ভূমিহীন মানুষ কোনোমতে জীবনযাপন করছেন। খাসজমি ভূমিহীনদের বন্দোবস্ত করার দাবি বারবার উপেক্ষা করা হচ্ছে। শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয়ভার শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি রংপুরের শোষিত-নিপীড়িত মানুষদের বাসদ-এর সাথে যুক্ত হয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
জনসভা শুরুর আগে বিভিন্ন দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড ও লাল পতাকা নিয়ে একটি মিছিল শাপলা চত্বর থেকে নগরীর প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে।



