গণমাধ্যমকর্মীদের সংস্কারের আগে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, মত প্রকাশের নিরপেক্ষ স্বাধীনতা সহ মাসিক বেতন ও ঝুঁকি ভাতার গ্যারান্টি জরুরি
এম শাহীন আলম: রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় গণমাধ্যমকে। আর এই চতুর্থ স্তম্ভই দেশের চলমান সমাজ ব্যবস্থায় ঘটে যাওয়া অন্যায়, অপরাধ,মাদক সন্ত্রাস, দুর্নীতি সহ অনিয়ম তুলে ধরতে প্রতিদিনই সংবাদকর্মীরা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিরলস ভাবে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলেও যে সত্য, যে সংবাদকর্মীরা পরিবার পরিজনের কথা না ভেবে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে খবর প্রকাশ করে মানুষকে সঠিকটা জানান দেন। কিন্তু রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ এই লড়াকু সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তা সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে আজ।
সম্প্রতি সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ ও ডাটাবেজ তৈরি কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। এই সাংবাদিক সংস্কার নিয়ে দেশের সর্বত্রে নানান আলোচনাও চলছে। সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত নন, কিংবা সাংবাদিকতার নিয়মকানুন সঠিকভাবে বুঝেন না এমন লোকেরাই নতুন নীতিমালা ও সংস্কারের কথা বলছেন, কেউ বা মিডিয়ার মালিকপক্ষের জবাবদিহিতা চাইছেন, আবার কেউ কেউ সাংবাদিকদের দায়িত্ব ও আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কিন্তু সাংবাদিকদের সংস্কারের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল এজেন্ডা হলো গণমাধ্যমকর্মীদের সার্বিক নিরাপত্তা,মত প্রকাশের নিরপেক্ষ স্বাধীনতা সহ মাসিক বেতন ও ঝুঁকি ভাতার গ্যারান্টি জরুরি এটা সাংবাদিক সমাজের এখন প্রাণের দাবী।
বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলেও সরকারের তথ্য মন্ত্রী এবং প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান এর মুখে সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সংস্কার নিয়ে অনেক বক্তব্য বয়ান শুনা গেছে। ওই সময়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের সকল জেলা তথ্য অফিসের মাধ্যমে সাংবাদিকদের ডাটাবেজও তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু এই ডাটাবেজ তালিকা প্রকাশ করার পর দেখা গেলো সাংবাদিকদের আবেদনের ভিত্তিতেই কোন যাচাই-বাছাই ছাড়াই যাঁরাই জেলা তথ্য অফিসে যোগাযোগ করে আবেদন করেছে ঠিক তাদের নামই সিরিয়ালে দেশের প্রতিটি জেলা তথ্য অফিস তালিকা প্রকাশ করেছিলো। এতে করে পেশাদার সাংবাদিকদের সাথে অপেশাদার সাংবাদিক, হলুদ সাংবাদিক, মৌশুমী সাংবাদিক, দলবাজ দালাল সাংবাদিক সহ সবাই মিলেমিশে একাকার হয়েছিলো। এই গোঁজামিল ডাটাবেজ তৈরি কিংবা প্রকাশের নামে সরকারের অহেতুক অর্থ নষ্ট আর মূল্যবান সময় ব্যয় ছাড়া প্রকৃত পক্ষে এই ডাটাবেজ সাংবাদিক কিংবা রাষ্ট্রের কোন উপকারে আসেনি। বর্তমান সময়ে দেশের সরেজমিনে সংবাদ সংগ্রহ করা প্রতিটি পেশাদার সাংবাদিকরাও চায় সরকারের স্বচ্ছ সাংবাদিক বান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন হউক। সাংবাদিক এবং রাষ্ট্রের উভয়ের প্রতি উভয়ের জবাবদিহিতা, সুযোগ সুবিধা, সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত মত প্রকাশের নিরপেক্ষ স্বাধীনতা সহ মিডিয়া কর্তৃক সাংবাদিকদের মাসিক বেতন ও ঝুঁকি ভাতার গ্যারান্টি নিশ্চিত হউক।
বলা হয় সাংবাদিকতা হলো সৃজনশীল একটি পেশা যা রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের মানুষের কল্যাণে নিজেকে উজার করে পরের তরে বিলিয়ে দেওয়া মতো একটি মহৎ কাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ে পেশাদার সাংবাদিকরা যারা নিউজ লিখতে পারে তারা জীবন জীবিকার টানে সরকারের বাস্তবিক অপব্যবস্থাপনা,জীবনের নিরাপত্তাহীনতা, মিডিয়া কর্তৃক নিয়মিত বেতন-ভাতা না পাওয়া,ঝুঁকি ভাতা না পাওয়ার কারণে এই মহান পেশা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আর রাষ্ট্রের সরকারি প্রতিষ্ঠান গুলোতে দুর্নীতি, সমাজে অসংগতি, মাদক সন্ত্রাস, অপরাধ বাড়ার কারণে অপেশাদার সাংবাদিক নামধারীদের দৌরাত্ম্য ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বর্তমান সময়ে দেশে যে পরিমাণ মিডিয়ার অনুমোদন আছে তাতে করে নিউজ লেখার মতো পেশাদার সাংবাদিকদের বড়ই সংকট হয়ে পড়েছে। তার মুল কারণ হলো পেশাদার সাংবাদিকদের মাসিক বেতন নেই বললেই চলে, ঝুঁকি ভাতারও নেই ব্যবস্থা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ে রাষ্ট্র বা সরকারের নেই কোন জোড়ালো পদক্ষেপ।
গণমাধ্যম সংস্কারে সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা সর্বনিম্ন স্নাতক ডিগ্রী পাশ করার পরিকল্পনা চলছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সরকারের তরফ থেকে এটা ভালো একটা সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। গণমাধ্যমের ভবিষ্যত স্বচ্ছতার কথা চিন্তা করে স্নাতক ডিগ্রী পাশ শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করার আগে সরকারকে সাংবাদিকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা, ঝুঁকি ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, সরকারি চাকুরী জীবিদের মতো আবাসন ব্যবস্থা সহ কর্তব্যরত মিডিয়া এবং সরকারের সমন্বয়ে এককালীন ফান্ডের ব্যবস্থা না করতে পারলে কোন যুবক বর্তমান সময়ে স্নাতক ডিগ্রী পাশ করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিনা বেতনে এই সাংবাদিক পেশায় আসবে বলে মনে হয় না। শিক্ষিত পেশাদার সাংবাদিকদের সরকারি সুযোগ সুবিধা না দিলে এই সাংবাদিক পেশায় ভবিষ্যতে অপ-সাংবাদিক,দলবাজ অপেশাদার, নামধারী মৌশুমী সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য আরো বেড়ে যাবে। শিক্ষাগত যোগ্যতার নির্ধারণের পাশাপাশি দলবাজ দালাল চাটুকার সাংবাদিক নিয়ন্ত্রণ করাও খুব জরুরি। কারণ এই দলবাজ সাংবাদিক নামধারীদের জন্য পেশাদার মাঠে ঘাটে সংবাদ সংগ্রহ করা পরিশ্রমী সাংবাদিকরা বর্তমানে সরকারি কিছু বিশেষ সুবিধা এবং সন্মাননা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল এবং পিআইবি’র মতো প্রতিষ্ঠানও পর্যাপ্ত পরিমাণ ফান্ডের অভাবে সাংবাদিকদেক প্রশিক্ষণ দিতে ব্যর্থ।
পেশাদার সাংবাদিকদের এগিয়ে নিতে এমন একটি আইন করা উচিত, যারা সরাসরি রাজনৈতিক সংগঠন বা দলের সাথে প্রকাশ্যে জড়িত তারা যেন এই সাংবাদিক পেশায় না আসতে পারে সরকারের সেই ব্যবস্থা করা উচিত। এই রাজনৈতিক নেতা নামের সাংবাদিকদের কারণে পেশাদার সাংবাদিকরাও আজ প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের কারণে পেশাদার সাংবাদিকদেরকেও মানুষ দালাল চাটুকার হিসেবে চিহ্নিত করে বাজে মন্তব্য করতে ভয় পায় না এবং সাংবাদিকদের যথাযথ সন্মান দেয় না। সরাসরি রাজনৈতিক দলের মতাদর্শী নামধারী সাংবাদিকরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে প্রেস আইডি কার্ড ব্যবহার করে দলীয় সাংবাদিক পরিচয়ে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অনৈতিক বিশেষ সুবিধা নেওয়ার ফলে পেশাদার সাংবাদিকদের সুনাম ব্যাহত হচ্ছে। অতএব রাজনৈতিক পেশায় সরাসরি জড়িতদের সাংবাদিকতায় যেন না আসতে পারে সে দিকে বিবেচনা করে সরকারের নীতিমালা গ্রহণ করাও জরুরি। আর যতোদিন সাংবাদিকরা রাজনৈতিক দলের সরাসরি পরিচয় বহন করে চলবে, ততো দিন দেশে অপ-সাংবাদিকতা, হলুদ সাংবাদিক, মৌশুমী সাংবাদিক নামধারীদের প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। সাংবাদিকতায় স্বচ্ছতা আনতে হলে দলবাজ লোকদের এ পেশা থেকে বিরত রাখতে হবে।
দলবাজ সাংবাদিক আর পেশাদার সাংবাদিকদের মধ্যে সরকারি সুযোগ সুবিধা ভোগের তফাৎ এবং একটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো – গত ড. ইউনুস সরকারের আমলের কথা বলি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে আওয়ামী সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন সরকারি দপ্তর গুলোতে শেখ হাসিনার আর্শীবাদপুষ্ট কর্মকর্তাদের সরিয়ে আরেক দলীয় বিবেচনায় নতুন করে কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তার ব্যতিক্রম ঘটেনি বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টেও। সেখানে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের মতাদর্শী একজনকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তার পূর্বের পরিচিত লোকজন, রাজনৈতিক দলীয় মতাদর্শী লোকজন সহ যারা তাকে তেল মারতে পেরেছে তিনি তাকে কল্যাণ ট্রাস্টের সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন এবং কি সর্বশেষ যখন জুলাই আগস্টের আন্দোলনের সাথে যুক্ত থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে সকল সাংবাদিকদেরকে রাষ্ট্রীয় সন্মাননা দিয়েছিলো সেখানেও কোন যাচাই-বাছাই না করে বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের এমডি সাহেব পেশাদার সাংবাদিক যোদ্ধাদের সন্মাননা না দিয়ে তিনি তার মতাদর্শী অপেশাদার যাদের কেউ কেউ এর জুলাই আগস্ট আন্দোলনে কোন নূন্যতম ভুমিকাই ছিলো না তাদেরকে তিনি রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত করার সুযোগ করে দেন। তাই সাংবাদিকতা থেকে রাজনৈতিক আধিপত্য কিংবা হস্তক্ষেপ সরিয়ে না নিলে ভবিষ্যতে এই পেশা আরো কলংকিত হবে এবং রাজনৈতিক অপ-সাংবাদিকতার আধিপত্য বেড়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
দেশে পর্যাপ্ত প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিকস মিডিয়ার সংখ্যা বাড়লেও নিউজ লিখতে পারে এমন পেশাদার সাংবাদিকদের সংখ্যা মিডিয়ার সংখ্যা তুলনায় অতি নগন্য। নিউজ লিখতে পারে এমন সাংবাদিকের চরম খড়া চলছে দেশের গণমাধ্যম গুলোতে। তাই বর্তমানে দেশে এখন পেশাদার সাংবাদিকদের লিখা নিউজ কপি পেস্ট করা অপেশাদার সাংবাদিকের ছড়াছড়ি বেশি। অনেক পেশাদার সাংবাদিক এখনও নিয়মিত বেতন-ভাতা পান না। অনেকেই মাসের পর মাস বেতন ছাড়াই কাজ করেন। বেশিরভাগ মিডিয়া হাউজে শুধুমাত্র আইডি কার্ড ছাড়া নিয়োগপত্র দিতে অপারগ, সংবাদকর্মীদের নিয়োগপত্র দিলে নিয়োগপত্রে উল্লেখ করতে হয় বেতন-ভাতা, তাই বেতন ভাতার না দেওয়ার কারণে নিয়োগপত্র দিতে আপত্তি মিডিয়া কর্তৃপক্ষের। নেই চাকরির ১% নিশ্চয়তা, নেই চিকিৎসা সুবিধা বা ঝুঁকিভাতা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলা, মামলা, হুমকি এমনকি প্রাণনাশের শিকারও হতে হয় সংবাদকর্মীদের। সাংবাদিকরা মামলা হামলার শিকার হলেও তাদের বিপদে মিডিয়া কর্তৃপক্ষের ভুমিকা একবারে নগন্য। সাংবাদিকরা যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন লিখেন, তখন তিনি শুধু একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন না, তিনি তখন তার লিখনীর মাধ্যমে রাষ্ট্র এবং সমাজের পক্ষে দাঁড়ান। অথচ সেই সংবাদকর্মীদের নিজের পরিবারই অনেক সময় অনিশ্চয়তায় নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকে। এতে করে পেশার মর্যাদা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি স্বাধীন সাংবাদিকতাও বাধাগ্রস্ত হয়।
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যদি গণমাধ্যমের প্রকৃত সংস্কারই চাওয়া হয় তাহলে প্রথমে সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বাধ্যতামূলক বেতন কাঠামো, চাকরির নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, জীবনবীমা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সংস্কারের আগে প্রয়োজন মানবিকতা। একজন সাংবাদিক যেন সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কারণ নিরাপদ ও স্বাবলম্বী সাংবাদিকরাই পারে সত্যকে নির্ভয়ে তুলে ধরতে। তাই গণমাধ্যম সংস্কারের আগে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মত প্রকাশের নিরপেক্ষ স্বাধীনতা সহ মাসিক বেতন-ভাতা ও চাকুরী শতভাগ গ্যারান্টি নিশ্চিত করা জরুরি।
লেখক – এম শাহীন আলম, সাংবাদিক ও সংগঠক।

