প্রশাসনরাজনীতি

একই দিনে বিশ্বজুড়ে রোজা ও ঈদ: তারেক রহমানের প্রস্তাব ও ১৯৮৬ সালের আম্মান ঘোষণার পুনর্জাগরণ

অধ্যাপক এম এ বার্ণিক | ঢাকা

সম্প্রতি এক ইফতার মাহফিলে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আলেম সমাজের প্রতি একটি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন— বিজ্ঞানের এই যুগে সারা বিশ্বের সঙ্গে সমন্বয় করে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালন করা যায় কি না, সে বিষয়ে নতুন করে ভেবে দেখার জন্য। তার এই প্রস্তাব রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়িয়ে ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষক ও ফকিহদের মতে, এই প্রস্তাব মূলত ১৯৮৬ সালে জর্দানের আম্মানে অনুষ্ঠিত ওআইসি’র (OIC) ঐতিহাসিক ফিকাহ অ্যাকাডেমির সিদ্ধান্তের সঙ্গেই সংগতিপূর্ণ।

১৯৮৬ সালের আম্মান ঘোষণা ও ফিকাহি ভিত্তি

১৯৮৬ সালে জর্দানে অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকাহ অ্যাকাডেমি’র অধিবেশনে মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ফকিহগণ একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে (এজমা) পৌঁছেছিলেন। সেই সম্মেলনের মূল নির্যাস ছিল— শরঈ কাঠামোর ভেতরে থেকেই বৈশ্বিক ঐক্যের পথ উন্মুক্ত রাখা। সেখানে বলা হয়েছিল, এক অঞ্চলে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে অন্য অঞ্চলের জন্য তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে, বিশেষ করে যেখানে কোনো ভৌগোলিক বাধা নেই। জ্যোতির্বিজ্ঞানকে পুরোপুরি ভিত্তি না ধরলেও চাঁদ দেখার সম্ভাবনা যাচাইয়ে একে সহায়ক হিসেবে গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছিল সেখানে।

অধ্যাপক এম এ বার্ণিকসহ অনেক গবেষক মনে করেন, তারেক রহমানের বক্তব্য কোনো চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ‘আম্মান ঘোষণা’রই এক আধুনিক সংস্করণ।

বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ ও আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডার

বর্তমানে তুরস্কসহ বিশ্বের বেশ কিছু মুসলিম দেশ ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ক্যালেন্ডার’ অনুসরণ করছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদের জন্ম (Astronomical New Moon) এবং এর দৃশ্যমানতার বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড বিশ্লেষণ করে আগেভাগেই নির্ভুল ক্যালেন্ডার প্রণয়ন সম্ভব। এতে করে:

  • রোজা, ঈদ ও হজের সময়সূচি নিয়ে বিভ্রান্তি দূর হয়।
  • আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক সমন্বয় সহজতর হয়।
  • মুসলিম উম্মাহর মাঝে ঐক্যের প্রতীক তৈরি হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও করণীয়

বাংলাদেশ ওআইসি-র একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. শমশের আলীসহ অনেক বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন ধরেই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে বৈশ্বিক সমন্বয়ের কথা বলে আসছেন। তবে বাংলাদেশে মূলত দুটি মত প্রচলিত— ‘স্থানীয় দিগন্তভিত্তিক চাঁদ দেখা’ এবং ‘বিশ্বব্যাপী একক চাঁদ দেখা’। ১৯৮৬ সালের সিদ্ধান্ত এই দুই মতের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখিয়েছে।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাস্তবায়নের পথ

তারেক রহমানের এই প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেকে। তাদের মতে, এটি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের বিষয় নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে শরিয়াহর সমন্বয় এবং উম্মাহর ঐক্যের প্রশ্ন। তবে এর বাস্তবায়নে প্রয়োজন: ১. আলেম সমাজের মধ্যে শরঈ ব্যাখ্যার ঐকমত্য। ২. আধুনিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঠিক প্রয়োগ। ৩. সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সরকার যদি দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং আন্তর্জাতিক ফিকাহ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সংলাপের আয়োজন করে, তবে আগামী ঈদ থেকেই এই বৈশ্বিক ঐক্যের পথে যাত্রা শুরু করা সম্ভব। ইতিহাস এবং আধুনিক বিজ্ঞান এখন একটি জ্ঞানভিত্তিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button