অপরাধআইন-শৃঙ্খলা

বনানীতে ‘মার্ভেল ইন’ ও ‘কার্টুন শেরাটন’ ঘিরে বিতর্ক: অনৈতিক বাণিজ্য ও জমির চুক্তিতে বড় অনিয়মের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানী। যেখানে কূটনৈতিক জোন আর করপোরেট অফিসের কারণে বাড়তি নিরাপত্তা ও আভিজাত্যের আমেজ থাকে, সেখানেই এখন বিতর্কের ঝড়। বনানীর ২৭ নম্বর রোডে অবস্থিত ‘মার্ভেল ইন’ এবং কথিত ‘কার্টুন শেরাটন’ নামের দুটি হোটেলকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর সব অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, আবাসিক সেবার আড়ালে এখানে চলছে ঘণ্টাভিত্তিক কক্ষ ভাড়া ও “স্কর্ট সার্ভিস” নামে অনৈতিক কার্যক্রম। শুধু তাই নয়, এই স্থাপনার জমি নিয়ে সিটি করপোরেশনের সাথে চুক্তিতেও উঠে এসেছে শত কোটি টাকার অনিয়মের গন্ধ।

⚠️ আভিজাত্যের আড়ালে কী চলছে?

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরে হোটেলটিতে গভীর রাতে সন্দেহজনক নারী-পুরুষের আনাগোনা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। নির্দিষ্ট দালালের মাধ্যমে এখানে অতিথি আনা-নেওয়া করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্থায়ী বাসিন্দা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের সন্তানরা এই এলাকায় বড় হচ্ছে। আবাসিক হোটেলের নাম করে যদি ভেতরে এসব চলে, তবে এলাকার সামাজিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে।”

🏢 ৫৫০ কোটি টাকার সম্পদ ও ‘অসম’ চুক্তি

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হোটেলের অবকাঠামোগত ভিত্তি ঘিরেই রয়েছে আইনি জটিলতা। ২০০৬ সালে বনানী কাঁচাবাজার সংলগ্ন সিটি করপোরেশনের প্রায় ৬০ কাঠা জমিতে বোরাক রিয়েল এস্টেট প্রাইভেট লিমিটেডের সাথে চুক্তি হয়।

চুক্তির শর্ত বনাম বর্তমান চিত্র:

  • চুক্তি: ৩০% অংশ সিটি করপোরেশনের, ৭০% নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের।
  • সময়সীমা: ২০১০ সালের মধ্যে কাজ শেষ করে হস্তান্তরের কথা ছিল।
  • লঙ্ঘন: ১৪ তলার অনুমতি নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ২৮ তলা ভবন।
  • ক্ষতি: ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও সিটি করপোরেশন তাদের প্রাপ্য অংশ (যার বাজারমূল্য প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা) বুঝে পায়নি।

তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সময়ে হওয়া এই চুক্তিকে এখন ‘অসম’ ও ‘অস্বচ্ছ’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

⚖️ আইন কী বলে?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রেড লাইসেন্স থাকা মানেই যেকোনো কার্যক্রম পরিচালনার বৈধতা নয়। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নারী সরবরাহ বা যৌন লেনদেনের সুযোগ করে দেয়, তবে তা মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া দণ্ডবিধির ২৯৪, ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারা অনুযায়ী এসব কর্মকাণ্ডের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

🗣️ কর্তৃপক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

হোটেল কর্তৃপক্ষ সকল অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, তাদের বৈধ ট্রেড লাইসেন্স ও সিটি করপোরেশনের অনুমোদন রয়েছে। স্বল্প সময়ের জন্য অতিথি রাখা হোটেল ব্যবসারই অংশ এবং ‘স্কর্ট সার্ভিস’ সংক্রান্ত তথ্যগুলো ভিত্তিহীন।

অন্যদিকে, বনানী থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি তারা গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রয়োজনে হোটেলের গেস্ট রেজিস্টার ও সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করা হবে এবং অপরাধের প্রমাণ পেলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


🔴 জনদাবি ও ভবিষ্যৎ

বনানীর মতো এলাকায় এমন অভিযোগ পুরো এলাকার সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা তিনটি প্রধান দাবি জানিয়েছেন:

  1. নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত।
  2. অবৈধ কার্যক্রম প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক লাইসেন্স বাতিল।
  3. সিটি করপোরেশনের জমি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পুনর্বিবেচনা।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, বনানী কি তার আভিজাত্য হারাবে নাকি প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ফিরবে স্বচ্ছতা? সত্য উদঘাটনে এখন প্রয়োজন কেবল সুষ্ঠু তদন্ত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button