ঘুষের বিনিময়ে যুবলীগ নেতাকে সুরক্ষা: সিএমপির ওসি আফতাবের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর প্রমাণ

রাশেদুল ইসলাম :আইনের রক্ষক হয়েও অপরাধীর ঢাল হিসেবে কাজ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন শেখের বিরুদ্ধে।
যুবলীগ নেতাকে গ্রেপ্তার না করার বিনিময়ে ঘুষ গ্রহণ, ব্যক্তিগত বিকাশে টাকা লেনদেন এবং মাদক কারবারিদের প্রশ্রয় দেওয়ার মতো একাধিক ঘটনার সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ এখন প্রকাশ্য। অভিযোগ রয়েছে, সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজের ঘনিষ্ঠজন হওয়ার সুবাদে তিনি বহাল তবিয়তে থেকে কোতোয়ালি থানাকে মাদক ও ঘুষের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওসির সরাসরি প্রশ্রয়েই এলাকায় মাদক ও বালু ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন যুবলীগ নেতা নোমান।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, গত ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর কর্ণফুলীর নতুন ব্রিজ এলাকার পুলিশ বক্সের ভেতরে এক চাঞ্চল্যকর অর্থ লেনদেন সম্পন্ন হয়। যুবলীগ নেতা নোমানকে গ্রেপ্তার না করার শর্তে ওসির পক্ষে ৪৫ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন এএসআই সুজন দাস মিঠু। ওই সময় আফতাব উদ্দিন শেখ বাকলিয়া থানার দায়িত্বে ছিলেন। শুধু তাই নয়, গত ১০ ডিসেম্বর অন্য এক ব্যক্তির কাছ থেকে নিজের ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে ১৮ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অকাট্য প্রমাণও পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্য ও হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটিং রেকর্ড অনুযায়ী, ৫ ডিসেম্বর বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটে ওসি আফতাব তার ব্যক্তিগত নম্বর থেকে যোগাযোগ করে ১ মিনিট কথা বলেন। এর ঠিক ৫ মিনিট পর ৪টা ৫০ মিনিটে ওই পক্ষকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দিয়ে ৩১ সেকেন্ড কথা বলেন এএসআই সুজন দাস মিঠু।
৫টা ৫২ মিনিট পর্যন্ত মোট চারবার কল দিয়ে কথা বলেন তিনি। সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে সুজন একটি অডিও বার্তা পাঠান। উত্তরে জানানো হয়, ওসির জন্য ৪৫ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছে। সুজন ফিরতি বার্তায় ইংরেজিতে ‘ওকে’ (OK) লিখে তা নিশ্চিত করেন। কিছুক্ষণ পর মামুন নামে এক ব্যক্তি পুলিশ বক্সে টাকা বুঝিয়ে দিলে এএসআই সুজন আরও ৫ হাজার টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আশ্চর্যজনক তথ্য হলো, সেবাপ্রত্যাশীদের প্রতিও এই কর্মকর্তার রয়েছে গভীর বৈষম্য ও রাজনৈতিক ক্ষোভ। বিশেষ করে বিএনপি সমর্থিত ব্যক্তিদের প্রতি তার বিদ্বেষের বিষয়টি উঠে এসেছে একটি অডিও রেকর্ডে। সেখানে ওসি আফতাবকে বলতে শোনা যায়, “তুমি তো জানো না, বিএনপি নেতাদের আমি থানায় ঢুকতে দেই না। তারা ভয়ে থানায় ঢুকে না। তাদেরকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখি।” একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ নিয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ মহলেও ব্যাপক সমালোচনা চলছে। এছাড়া ওসির যাবতীয় অবৈধ অর্থ নিয়ন্ত্রণ করেন জুয়েল রানা নামে এক ব্যক্তি, যার বাড়ি ওসির নিজ জেলা গাজীপুরের শ্রীপুরে। অভিযোগ রয়েছে, ওসির ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন এই জুয়েল।
গত অক্টোবরে ওসি যখন সরকারি প্রশিক্ষণে চীনে যান, সফরসঙ্গী হিসেবে জুয়েলকেও সেখানে দেখা যায়। একজন সাধারণ ব্যক্তির ওসির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় আদলে বিদেশ সফর নিয়ে খোদ পুলিশ বিভাগেই কানাঘুষা চলছে।
এ বিষয়ে এএসআই সুজন দাসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন নম্বরের সত্যতা নিশ্চিত করলেও টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। সুজনের বক্তব্য নেওয়ার কিছুক্ষণ পরই ওসি আফতাব যুবলীগ নেতা নোমানকে ফোন দিয়ে তার ঘুষ নেওয়ার কোনো ভিডিও ফাঁস হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন বিস্তারিত কথা বলতে অন্তত ১০ সেকেন্ডের জন্য হলেও থানায় যাওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, “১০ সেকেন্ডের জন্য থানায় আসেন, একটা রিলেশন হবে।”



