রোকন মেম্বার লাল বাদশার সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে অভিযান অস্ত্র ককটেল উদ্ধার থানায় মামলা

মুহাম্মদ জুবাইর
রোকন মেম্বার লাল বাদশা বাহিনীর ত্রাসের রাজত্ব ভাঙল যৌথ অভিযান
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়ন এর জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাস অস্ত্রবাজি মাদক ব্যবসা চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছিল রোকন মেম্বার ও লাল বাদশা বাহিনী।অবশেষে যৌথ বাহিনীর অভিযানে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন নগর অফিসে অভিযান চালিয়ে পিস্তল ককটেলসহ বিপুল অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযানের সময় প্রধান আসামি রোকন মেম্বার লাল বাদশা সহ তাদের সহযোগীরা পালিয়ে যায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র জানায় মামলায় উল্লেখিত আসামিরা সবাই চিহ্নিত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী এবং একাধিক মামলার আসামি। এমন কোন অপরাধ নেই যে তারা করে না। তারা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ভূমিদস্যুতা অস্ত্রবাজি মাদক ব্যবসা চাঁদাবাজি দখলবাজি সহ নানা অপরাধে জড়িত। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল এই চক্রটি। সাধারণ মানুষ তাদের ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পেত না বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায় ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখ রাত দেড়টার দিকে বাদীর টাইপকৃত ও স্বাক্ষরিত এজাহার সীতাকুণ্ড মডেল থানায় গ্রহণ করা হয়। পরে সীতাকুণ্ড মডেল থানায় মামলা নম্বর ১৯/১০২০২৪ ধারা অস্ত্র আইন উনিশ এ ও ১৯ এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৪ ধারায় নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়।
এজাহারে বাদী এসআই সৈয়দ সফিউল করিম উল্লেখ করেন তিনি সঙ্গীয় পুলিশ সদস্য এসআই মো: বিল্লাল হোসেন এসআই নিরস্ত্র মো: ইদ্রিস আলী এসআই নিরস্ত্র মো: মাহমুদুল হাসান এসআই নিরস্ত্র কামরুজ্জামান এসআই আবুল হোসেন ও কনস্টেবল আব্দুল করিমসহ সীতাকুণ্ড মডেল থানার একটি টিম নিয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওই সময় সেনাবাহিনী সীমান্তরক্ষী বাহিনী র্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানের অংশ হিসেবে এলাকায় দায়িত্বে ছিলেন তারা।
৯ মার্চ ২০২৬ তারিখ দুপুর প্রায় দুইটা চল্লিশ মিনিটে সলিমপুর ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ড আলীনগর স্কুলের সামনে অবস্থানকালে গোপন সংবাদের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল এলাকার গোলাপের মোড়ের দক্ষিণ পাশে রোকন মেম্বারের নিয়ন্ত্রণাধীন নগর অফিসে কয়েকজন ব্যক্তি ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ে অবস্থান করছে।
গুরুত্বপূর্ণ এ সংবাদের ভিত্তিতে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়।পরে নির্দেশক্রমে সেনাবাহিনী সীমান্তরক্ষী বাহিনী র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে একটি যৌথ অভিযান টিম গঠন করা হয়। বিকাল প্রায় তিনটার দিকে যৌথ বাহিনী ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল এলাকায় পৌঁছে অভিযানে অংশ নেয়।
যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সাথে সাথে সেখানে অবস্থানরত সন্ত্রাসীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত বিভিন্ন দিকে দৌড়ে পালিয়ে যায়। ফলে কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে পালিয়ে যাওয়ার সময় তারা তাদের ব্যবহৃত অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য ফেলে রেখে যায়।
পরে উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে নগর অফিসের ভেতরে তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশির সময় অফিস কক্ষের দ্বিতীয় কক্ষের সানসেটের উপর একটি শপিং ব্যাগের ভিতর মোড়ানো অবস্থায় একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। পিস্তলটির দৈর্ঘ্য প্রায় দশ ইঞ্চি এবং এর গ্রিপের সামনের অংশ ভাঙা ছিল। অস্ত্রটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের উপযোগী বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই কক্ষের পশ্চিম কোণে কালো পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় সাতটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করা হয়। প্রতিটি ককটেল বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় ছিল বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে।
এছাড়া একটি প্লাস্টিকের বস্তা থেকে আটটি কাঠের বাটযুক্ত ধারালো হাসুয়া উদ্ধার করা হয়। বিভিন্ন মাপের এসব ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে এলাকায় ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রতিপক্ষের উপর হামলার পরিকল্পনা ছিল বলে ধারণা করছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
অভিযান চলাকালে ঘটনাস্থলের আশেপাশে রাস্তার পাশে স্থাপন করা নয়টি নজরদারি ক্যামেরাও জব্দ করা হয়। স্থানীয়দের ধারণা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং প্রতিপক্ষ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য এসব ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল।
পরে বিকাল প্রায় তিনটা বিশ মিনিটে উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে জব্দ তালিকা প্রস্তুত করে উদ্ধারকৃত অস্ত্র বিস্ফোরক ও অন্যান্য আলামত জব্দ করা হয় এবং সাক্ষীদের স্বাক্ষর গ্রহণ করা হয়।
উপস্থিত স্থানীয় লোকজন ও সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদে পলাতক আসামিদের নাম পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়।
মামলার পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছে মো রোকন উদ্দিন ৪১ পিতা শফিউল আলম সাং কাজী বাড়ি ফকিরহাট ছয় নম্বর ওয়ার্ড। শাহজাহান বাদশা ওরফে লাল বাদশা ৩৯ পিতা মৃত দুদু মিয়া সাং জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল। মো: মিজানুর রহমান রাজু ৫১ পিতা আব্দুস ছালাম মিয়া সাং জঙ্গল সলিমপুর। লুৎফুর রহমান ৩২ পিতা মৃত নুরুল ইসলাম সাং জঙ্গল সলিমপুর বড় হুজুরের বাড়ি। মো: কাশেম ওরফে নলা কাশেম ২৮ পিতা কাঞ্চন ফরাজী সাং জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল। রাসেল ওরফে রাসেল হুজুর ৩৮ পিতা অজ্ঞাত। সুরুজ ওরফে সুজা ৪৫ পিতা অজ্ঞাত। এছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও পনের থেকে বিশ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ জানায় আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্রশস্ত্র মজুদ করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে আসছিল। থানা রেকর্ড যাচাই করে তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান দীর্ঘদিন ধরে এই সন্ত্রাসী চক্রের কারণে এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছিল। ভূমি দখল মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে তারা বিপুল অর্থ উপার্জন করছিল এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এলাকায় শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।



