সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা তদন্তে পিবিআইকে নির্দেশ আদালতের

মুহাম্মদ জুবাইর
চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক এক নেতা সংগঠনটির সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অপপ্রচারের অভিযোগ এনে সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে মামলা করেছেন। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে নির্দেশ দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক কাজী মিজানুর রহমান মামলার অভিযোগটি গ্রহণ করে তদন্তের নির্দেশ দেন।মামলাটি দায়ের করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চট্টগ্রাম মহানগরের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রিদুয়ান সিদ্দিকী। তিনি ফটিকছড়ি উপজেলার নানুপুর ইউনিয়নের শাহ সিদ্দিক বাড়ির বাসিন্দা এবং আবদুর রহিমের ছেলে।
মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে দৈনিক চট্টগ্রাম প্রতিদিনের সম্পাদক হোসাইন তৌফিক ইফতিখার,যুগান্তরের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, সমকালের জ্যেষ্ঠ সহ সম্পাদক নাসির উদ্দিন হায়দার, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি রতন কান্তি দেবাশীষ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব মহসিন কাজী, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও আজকের পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সবুর শুভ এবং চ্যানেল আইয়ের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান চৌধুরী ফরিদকে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আরিফ উর রহমান চৌধুরী বলেন, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এর ২৬(১) ও ২৬(২) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। আদালত প্রাথমিকভাবে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করতে পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ৪ মার্চ তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব পরিদর্শনে এলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে বাদী তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বেলা ১টার দিকে অনুষ্ঠিত ওই সাক্ষাতে তিনি চট্টগ্রামে গণমাধ্যমে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং নারী আন্দোলনকারীদের লাঞ্ছনার অভিযোগ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত তথাকথিত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পরে সন্ধ্যায় একই দাবিতে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর কাছে একটি লিখিত স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
বাদীর দাবি, ওই দিন রাত ১১টার দিকে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেখতে পান যে অভিযুক্ত হোসাইন তৌফিক ইফতিখার তার ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে তার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক পোস্ট দিয়েছেন। সেই পোস্টে অভিযুক্ত শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, নাসির উদ্দিন হায়দার, রতন কান্তি দেবাশীষ ও মহসিন কাজী মন্তব্য করেন এবং সবুর শুভ ও চৌধুরী ফরিদ প্রতিক্রিয়া জানান।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এসব পোস্ট ও মন্তব্যের মাধ্যমে বাদী এবং সংগঠনের সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে,যা তাদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।
তবে মামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সাংবাদিকরা। দৈনিক চট্টগ্রাম প্রতিদিনের সম্পাদক হোসাইন তৌফিক ইফতিখার বলেন,গণমাধ্যমে হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনায় সাংবাদিকরা কেউ জড়িত নন। নারী আন্দোলনকারীদের লাঞ্ছনা বা নিপীড়নের বিষয়েও সাংবাদিকরা অবগত নন।
তিনি দাবি করেন,গত ৫ মার্চ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকের সময় সংঘবদ্ধভাবে একটি মব তৈরি করা হয়।সেখানে সমন্বয়ক পরিচয়দানকারী রিদুয়ান সিদ্দিকী ও তার সহযোগীরা পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর হামলার নেতৃত্ব দেন। সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয়েও তার নেতৃত্বে এই হামলা সংঘটিত হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
হোসাইন তৌফিক ইফতিখার আরও বলেন, ওই ঘটনার প্রতিবাদ করায় রিদুয়ান সিদ্দিকী ও তার সহযোগীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও মানহানিকর অপপ্রচার চালাচ্ছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন মাধ্যমে তাকে শারীরিক হামলার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। এতে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি কোতোয়ালী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন।
অন্যদিকে মামলার বাদী রিদুয়ান সিদ্দিকী বলেন, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক তার বিরুদ্ধে ফেসবুকে নেতিবাচক পোস্ট ও মন্তব্য করেছেন। তিনি কাউকে কোনো ধরনের হুমকি দেননি বলে দাবি করেন।
এদিকে জানা গেছে, গত ১৫ জানুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক পরিচয়দানকারী রিদুয়ান সিদ্দিকী ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ে গিয়ে ছাত্রদলে যোগ দেন। এ বিষয়টিও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে।
সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা করার ঘটনায় সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা অবিলম্বে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি শহীদ উল আলম, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি সালাহউদ্দিন মো. রেজা, সাধারণ সম্পাদক দেবদুলাল ভৌমিক এবং চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী।
এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের আমলেও বাকস্বাধীনতা, ভিন্নমতের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার অপচেষ্টা চলছে। একটি সুযোগসন্ধানী চক্র সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে হয়রানি করার চেষ্টা করছে। তারা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান। সহজ



