অন্যান্যঅব্যাবস্থাপনাদেশবাংলাদেশ

নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপে বাংলাদেশ: জ্বালানি রেশনিং চলমান খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮% ছাড়িয়েছে

মোঃ উদ্দিন মিলন, ঢাকা: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর দেশ একটি “রূপান্তরমূলক রাজনৈতিক পরিবর্তনের” মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

নির্বাচন-পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ৫ আগস্ট ২০২৫-এ ফেব্রুয়ারিতে ভোটের কথা বলেন এবং নির্বাচন কমিশন ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তফসিল ঘোষণা করে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে কাজ করছে। তবে প্রবৃদ্ধি ৪.৭-৪.৯% এর ঘরে থাকলেও মূল্যস্ফীতি ৮% এর উপরে রয়েছে, যা দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে।

জ্বালানি তেল সংকট ও রেশনিং
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানে বিমান হামলা এবং ইরানের পাল্টা হামলার পর হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে দৈনিক প্রায় ১.৮ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়। বৈশ্বিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ১১১ ডলার/ব্যারেল ছাড়ায়, আর জেট ফুয়েল ও ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়।

বাংলাদেশ আমদানির উপর ৯৫% নির্ভরশীল। সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) গত মার্চ থেকে দৈনিক জ্বালানি বিক্রয়ে সীমা আরোপ করে: মোটরসাইকেলে ২ লিটার, প্রাইভেট কারে ১০ লিটার, দূরপাল্লার বাস-ট্রাকে ২০০-২২০ লিটার ডিজেল। তবে ঈদুল ফিতরের ছুটিতে যাত্রী চলাচল নিশ্চিত করতে এই রেশনিং সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়।

৩ মার্চ বিপিসি জানায়, দেশে ১৪ দিনের ডিজেল, ২৮ দিনের অকটেন, ১৫ দিনের পেট্রোল মজুদ আছে। তবুও আতঙ্কিত ক্রয় ঠেকাতে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়, যদিও জ্বালানি মন্ত্রী আপাতত তা নাকচ করেন।

খাদ্যদ্রব্যের দাম ও অর্থনৈতিক চাপ
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে। সরকার ও বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৬ সালে মূল্যস্ফীতি ৮% এর বেশি, যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় মাসে ৭৬-৮৩ কোটি ডলার বেড়ে যাওয়ায় “ফিসকাল ইমার্জেন্সি”র শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গ্যাস সংকটে কাতার এলএনজি সরবরাহ স্থগিত করায় সরকার ৪টি সার কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। এতে ইউরিয়া আমদানি বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, যা খাদ্য উৎপাদন খরচ আরও বাড়াবে বলে কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন।

সরকারের পদক্ষেপ
বহিঃঅর্থায়ন
জ্বালানি ও এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করতে এডিবি, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ থেকে ২০০ কোটি ডলারের বেশি তহবিল চাওয়া হচ্ছে। আইএমএফের কাছ থেকে ১৩০ কোটি ডলার ও এডিবি থেকে ৫০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিকল্প উৎস যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়া থেকে ৬ লাখ টন ডিজেল আমদানির জন্য ওয়েভার চাওয়া হয়েছে। ভারত, চীন, উজবেকিস্তান থেকেও জ্বালানি আনার চেষ্টা চলছে।

ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ
বিশেষজ্ঞরা “ন্যাশনাল ফুয়েল পাস” চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে প্রতিটি লেনদেন গাড়ির সাথে যুক্ত থাকে এবং কালোবাজারি বন্ধ হয়।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও “অশ্লীলতা” বিতর্ক
জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশে সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ফিলিপাইনে জ্বালানি দাম দ্বিগুণ হওয়ায় হাজার হাজার জিপনি চালক রাস্তায় নামে। অস্ট্রেলিয়া জ্বালানি কর অর্ধেক করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের দাম বাড়ার কারণে ভোক্তা পর্যায়ে তেমন প্রভাব পড়ছে না। এই অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও “সংকীর্ণ স্বার্থের” কারণে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে বলে রয়টার্সের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের কথা থাকলেও, সরকার উত্তরণ পেছানোর অনুরোধ করেছে, কারণ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ এখনো প্রকট।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button