অপরাধচট্টগ্রাম

চান্দগাঁওয়ে মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে চরম উত্তেজনা

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রাম মহানগরের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় জমি ও একটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে বিস্ফোরণমুখী পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। আদালতের সুস্পষ্ট অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি থাকা সত্ত্বেও একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে দখলচেষ্টা, মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতির কারণে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে।

ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠান ওয়াহিদ ইলেকট্রিশিয়ান্স ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, এটি একটি নিবন্ধিত সামাজিক সংগঠন, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক ইলেকট্রিশিয়ানদের কল্যাণে কাজ করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি অসচ্ছল পরিবারের সন্তানদের বৃত্তি প্রদান, তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন, এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বহু যুবক দক্ষতা অর্জন করে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, দেওয়ানী মামলা নং ৩০৩/২০২৫ এর প্রেক্ষিতে সিনিয়র সিভিল জজ ৫ম আদালত গত ৩০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। আদালতের আদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়, মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিবাদীপক্ষ কোনোভাবেই উক্ত সম্পত্তিতে বাদীপক্ষের শান্তিপূর্ণ দখল ও কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না।

আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর আওতাধীন চান্দগাঁও থানা থেকে বিবাদীপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিশ প্রদান করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই নোটিশকে উপেক্ষা করে অভিযুক্তরা উল্টো আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং দখলচেষ্টাসহ নানা ধরনের অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিতর্কিত সম্পত্তিটি চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার প্লট নং ১৬, ব্লক ‘এ’, রোড নং ০১-এ অবস্থিত, যার আয়তন প্রায় ১০ হাজার ৮০০ বর্গফুট। সেখানে একটি দুইতলা পাকা ভবন, একটি টিনশেড সেমিপাকা ঘর এবং কিছু খোলা জায়গা রয়েছে। ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি, এই সম্পত্তি দীর্ঘদিন ধরে তাদের সামাজিক ও প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নুরু মিয়া, আওলাদ হোসেন, রায়হান সিদ্দিকী, নুর হোসেন, আহমদ কবির লেদু এবং নাজিম উদ্দিন চৌধুরী এনেলসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে দখলচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা বিভিন্ন সময়ে ২০-২৫ জন লোক জড়ো করে মব সৃষ্টি করে এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে।

অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্তরা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে, কর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং কিছু মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত ও লুট করে নিয়ে যায়। এতে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।

ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্তদের মধ্যে আহমদ কবির লেদু ও তার সহযোগীরা প্রায় ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা বিভিন্নভাবে হুমকি ও হয়রানি শুরু করে।

একটি কল রেকর্ডে অভিযুক্তকে বলতে শোনা যায়,“এই এলাকায় কিছু করতে হলে আমাকে ছাড়া করা যাবে না থানা প্রশাসন আমার পকেটে আমার সিদ্ধান্ত ছাড়া কেউ কাজ করতে পারবে না।”

এই ধরনের বক্তব্য এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এবং প্রশাসনের ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর শীর্ষ নেতাদের নাম ব্যবহার করছে। তবে স্থানীয় সূত্র বলছে, তারা বাস্তবে ওই দলের কোনো দায়িত্বশীল পদে নেই।

এ ধরনের নাম ভাঙিয়ে অপতৎপরতা চালানোয় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে এবং রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্তরা অনুমতি ছাড়া মানববন্ধন আয়োজন করে এবং মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্যসম্বলিত ব্যানার প্রদর্শন করে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এতে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠানকে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে এলাকায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সাধারণ মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।

ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক সাধারণ ডায়েরি দায়ের করা হয়েছে চান্দগাঁও থানা-এ। পাশাপাশি বিষয়টি র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক দপ্তরেও জানানো হয়েছে। তবে এখনো দৃশ্যমান কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ভুক্তভোগী পক্ষ চরম হতাশা প্রকাশ করেছে।

ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাস্থলে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরায় অভিযুক্তদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া একাধিক কল রেকর্ডও রয়েছে, যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে। প্রয়োজনে এসব তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে।

ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. আবদুল বাতেন বলেন, “আমরা একটি বৈধ ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছি। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী চক্র আমাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে চাচ্ছে। তারা প্রশাসন ও রাজনৈতিক পরিচয়ের নাম ব্যবহার করে আমাদের ভয় দেখাচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমি বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছি না। যেকোনো সময় হামলার আশঙ্কা রয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তারা আইন অমান্য করছে।”

অভিযুক্ত আহমদ কবির লেদু অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। তার দাবি, তিনি কোনো চাঁদা দাবি করেননি এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই বিরোধের কারণে এলাকায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় তরুণদের ক্ষতি হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।
তারা দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং স্থায়ী সমাধান কামনা করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে যদি এ ধরনের দখলচেষ্টা, মব সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ঘটনা অব্যাহত থাকে, তাহলে তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ভুক্তভোগী পক্ষের জোর দাবি, আদালতের নিষেধাজ্ঞা দ্রুত কার্যকর করা,অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ,প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই পারে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button