ব্যানার ধরার লোক ছিল না, এখন ঘরে ঘরে নেতা
মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রাম নগরীর রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে তথাকথিত “হাইব্রিড নেতা”, সুবিধাবাদী রাজনীতি এবং টাকার বিনিময়ে রাজনৈতিক পদ-পদবি বাণিজ্যের অভিযোগ। এক সময় যেখানে বিএনপির একটি ব্যানার ধরার জন্য প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মী ছাড়া কাউকে খুঁজে পাওয়া যেত না, আজ সেখানে একই ব্যানারের পেছনে শত শত নেতা পরিচয়দানকারী ব্যক্তিকে দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতির এই আকস্মিক রূপান্তর সাধারণ মানুষের মাঝেও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাজনীতি কি এখন আর আদর্শ, ত্যাগ ও মানুষের সেবার জায়গায় নেই? রাজনীতি কি এখন শুধুই ক্ষমতা, প্রভাব আর অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে?
সম্প্রতি “উত্তর কাট্টলী” নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ছবি ও স্ট্যাটাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। সেখানে লেখা হয়, “আহ্ কাট্টলী বিএনপির রাজনীতি এমন এক সময় ছিল, ব্যানার ধরার জন্য লোক ছিল না। তখন আলহাজ্ব মোঃ রফিক উদ্দিন চৌধুরী ভাই একাই মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আর আজ ৫ তারিখের পরের হাইব্রিড নেতারা কাউন্সিলর হওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করছেন।” এই একটি পোস্ট যেন বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। কারণ শুধু কাট্টলী নয়, চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এখন একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের একাধিক প্রবীণ ব্যক্তি বলছেন, আওয়ামী লীগের আমলে যখন বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, হামলা, গ্রেফতার ও নির্যাতনের ঘটনা নিয়মিত ঘটত, তখন রাজপথে প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মীদেরই দেখা মিলত। অনেকেই বছরের পর বছর জেল খেটেছেন, অনেকে ব্যবসা হারিয়েছেন, পরিবার ছেড়ে আত্মগোপনে থেকেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হঠাৎ করেই নতুন এক শ্রেণির নেতার আবির্ভাব ঘটেছে, যাদের অতীতে দলের কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে দেখা যায়নি। অথচ এখন তারা বড় বড় পদ-পদবির দাবিদার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে অনেকেই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নাম ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। তারা বিভিন্ন তৃণমূল নেতার সাথে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের বড় একটি অংশের বিরুদ্ধে রয়েছে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ফিটিংবাজি, ছিনতাই, অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা এবং মিথ্যা মামলায় মানুষকে ফাঁসানোর অভিযোগ।
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, আকবর শাহ, কোতোয়ালী, বন্দর, বাকলিয়া, ডবলমুরিংসহ বিভিন্ন থানার স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এসব কথিত নেতা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করছে। তাদের অনেকে আবার রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি পুলিশের সোর্স হিসেবেও কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তৃণমূল বিএনপি কর্মী বলেন, “আমরা রাজনীতি করেছি রক্ত দিয়ে। হামলা-মামলার শিকার হয়েছি, জেল খেটেছি, পালিয়ে থেকেছি। আর এখন যারা টাকার বিনিময়ে পদ কিনে দলে ঢুকেছে, তারাই বড় নেতা হয়ে গেছে। তারা এলাকায় দাপট দেখাচ্ছে, মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে, অথচ প্রকৃত ত্যাগী নেতাদের কেউ মূল্যায়ন করছে না।”
তিনি আরও বলেন, “এখন একটা ছবি তুললেই নেতা হওয়া যায়। দুই-চারটা পোস্ট দিলেই নেতা হওয়া যায়। বিএনপির ব্যানার এখন টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। যারা একসময় আওয়ামী লীগের আশেপাশে ঘুরত, তারাই এখন বিএনপির পরিচয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
এদিকে সচেতন মহলের অভিযোগ, রাজনৈতিক দলে অনুপ্রবেশকারীদের কারণে দলীয় শৃঙ্খলা ও আদর্শ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা বলছেন, বর্তমানে কিছু ব্যক্তি রাজনীতিকে মানুষের সেবা নয়, বরং ব্যক্তিগত ব্যবসা ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। এদের অনেকে আবার প্রকাশ্যে সিনিয়র নেতাদের নাম ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব দেখায় এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “এখন রাজনীতি মানেই ভয়। কে আসল নেতা আর কে ভুয়া নেতা, সেটাই বুঝা কঠিন। অনেকেই রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদা দাবি করে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাপ সৃষ্টি করে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়।”
চট্টগ্রাম নগরীর একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, বর্তমানে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর ভেতরে আদর্শিক সংকট তৈরি হয়েছে। অতীতে রাজনীতি মানে ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং সমাজ পরিবর্তনের জন্য কাজ করা। কিন্তু এখন অনেকেই শুধুমাত্র অর্থ, ক্ষমতা ও ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য রাজনীতিতে প্রবেশ করছে। এতে প্রকৃত রাজনীতিবিদরা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “এখন ঘরে ঘরে নেতা।
বিএনপি নেতা পরিচয় দিয়ে অনেকে পুলিশের সাথেও খারাপ ব্যবহার করে। আমরা বুঝবো কীভাবে কে প্রকৃত নেতা আর কে নয়? অনেক সময় দেখা যায়, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সবচেয়ে বেশি, তারাই আবার রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে।”
তিনি আরও বলেন, “অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক চাপের কারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেই ফোন আসে, সুপারিশ আসে, বদলির ভয় দেখানো হয়। এতে করে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না।”
সচেতন মহলের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এখনই নিজেদের ভেতরের সুবিধাবাদী ও অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া। যারা সত্যিকার অর্থে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন এবং দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করেছেন, তাদের মূল্যায়ন করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে তৃণমূল পর্যায়ে চরম হতাশা তৈরি হবে এবং রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাবে।
স্থানীয়রা বলছেন, বর্তমানে কিছু কথিত নেতা কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে। কেউ দখলবাজি করছে, কেউ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছে, কেউ অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছে, আবার কেউ পুলিশের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব কারণে সাধারণ মানুষ এখন রাজনীতিকে ভয় পেতে শুরু করেছে।
তৃণমূল বিএনপির এক প্রবীণ নেতা বলেন, “রাজনীতি এখন আর আগের মতো নেই। আগে মানুষ আদর্শের জন্য রাজনীতি করত, এখন অনেকে টাকার জন্য রাজনীতি করে। যারা একসময় রাজপথে ছিল না, আজ তারাই সামনে চলে এসেছে। প্রকৃত কর্মীরা পেছনে পড়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “দল যদি এখনই এসব বিষয়ে কঠোর না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সাংগঠনিক সংকট তৈরি হবে। কারণ সাধারণ মানুষ সবকিছু দেখছে। তারা বুঝতে পারছে কে প্রকৃত রাজনীতিবিদ আর কে শুধুই সুবিধাবাদী।”
সচেতন নাগরিকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত দলে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া।
একইসাথে যারা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তারা বলছেন, রাজনীতি কখনোই অপরাধীদের আশ্রয়স্থল হতে পারে না। রাজনীতি হবে মানুষের কল্যাণের জন্য, সমাজ পরিবর্তনের জন্য এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য। কিন্তু যদি রাজনৈতিক ব্যানার ব্যবহার করে অপরাধীরা নিজেদের নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তোলে, তাহলে ভবিষ্যতে সমাজে অস্থিরতা আরও বাড়বে।
চট্টগ্রামের সচেতন মহলের দাবি, রাজনৈতিক দলগুলোকে এখনই আত্মসমালোচনায় বসতে হবে। প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন এবং সুবিধাবাদী হাইব্রিডদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা ছাড়া রাজনৈতিক অঙ্গনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। অন্যথায় “ঘরে ঘরে নেতা” সংস্কৃতি একসময় পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে।



