মতামত

অর্থনীতির ভাষা জনগণের ভাষায় হোক: ঋণখেলাপি, লুটপাট ও পাচারের বাস্তবতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন

বিল্লাল বিন কাশেম: বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা এখন প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে। সংবাদপত্রের পাতা, টেলিভিশনের টকশো, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম- সবখানেই অর্থনীতি একটি আলোচিত বিষয়। কখনো বলা হচ্ছে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত কম, কখনো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে উদ্বেগ, কখনো মূল্যস্ফীতি, আবার কখনো প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্ক। অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও গবেষকেরা পরিসংখ্যান, সূচক ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করছেন।

কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো- সাধারণ মানুষ এসব কতটুকু বোঝে? একজন রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, নিম্নমধ্যবিত্ত চাকরিজীবী কিংবা গার্মেন্টস কর্মী “ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও” বা “ম্যাক্রোইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি”র জটিল ব্যাখ্যা হয়তো বোঝেন না। কিন্তু তারা খুব ভালোভাবেই বোঝেন ঋণখেলাপি কী, ব্যাংক লুট কাকে বলে, শেয়ারবাজার ধসের কষ্ট কেমন এবং বিদেশে টাকা পাচারের অর্থ কী।

মানুষ বুঝতে পারে, তার কষ্টার্জিত টাকার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা ব্যাংক যদি কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি লুট করে নেয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষতির বোঝা জনগণের ঘাড়েই পড়ে। মানুষ বুঝতে পারে, রাষ্ট্র যদি কর বাড়ায় কিন্তু দুর্নীতি কমাতে না পারে, তাহলে সাধারণ নাগরিকের জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তাই অর্থনীতির পণ্ডিতদের উচিত হবে কেবল তাত্ত্বিক ভাষণে সীমাবদ্ধ না থেকে জনগণের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বাস্তব বিষয়গুলো নিয়ে আরও স্পষ্ট ও সাহসী আলোচনা করা। তাহলেই জাতি প্রকৃত অর্থে উপকৃত হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো- অর্থনৈতিক অপরাধের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ঋণখেলাপি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি যেন এক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করেও অনেকে দিব্যি প্রভাবশালী অবস্থানে থেকে যাচ্ছেন। কেউ বিদেশে ব্যবসা করছেন, কেউ বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন, কেউ আবার নতুন ঋণও পাচ্ছেন।

অথচ একজন সাধারণ কৃষক সামান্য ঋণের কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে তাকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যাংকের দরজায় ঘুরে ক্লান্ত হন, কিন্তু বড় ঋণখেলাপিদের জন্য যেন সব পথ খোলা। এই বৈষম্য মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ তৈরি করে।

একটি রাষ্ট্রে যদি সৎ মানুষ শাস্তি পায় আর অসৎ মানুষ পুরস্কৃত হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ তখন মানুষ উৎপাদন, উদ্ভাবন বা পরিশ্রমের চেয়ে প্রভাব ও অনিয়মকে বেশি কার্যকর মনে করতে শুরু করে। এটি শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, পুরো সমাজব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে গত এক দশকে বহু আলোচনা হয়েছে। একের পর এক কেলেঙ্কারি জনগণের আস্থা নষ্ট করেছে। কখনো ঋণ জালিয়াতি, কখনো ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ উত্তোলন, কখনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনিয়ম- সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ব্যাংক কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি জনগণের আমানতের প্রতিষ্ঠান। সাধারণ মানুষ তাদের জীবনের সঞ্চয় ব্যাংকে জমা রাখে এই বিশ্বাসে যে, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান তাদের অর্থের নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু যখন দেখা যায় কিছু ব্যক্তি হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেও আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে, তখন মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে।

ব্যাংক ফোকলা হওয়ার অর্থ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়; এটি পুরো অর্থনীতির জন্য বিপদ। কারণ ব্যাংক দুর্বল হলে বিনিয়োগ কমে যায়, ব্যবসা সংকুচিত হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বড় কথা, এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে- মূল্যস্ফীতি বাড়ে, কর্মসংস্থান কমে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়।

শেয়ারবাজার বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত মানুষের স্বপ্ন ও হতাশার এক বড় প্রতীক। বহু মানুষ তাদের সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন ভবিষ্যতের নিরাপত্তার আশায়। কিন্তু নানা সময় বাজার কারসাজি, কৃত্রিম উত্থান-পতন এবং নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে অসংখ্য ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নিঃস্ব হয়েছেন।

শেয়ারবাজারে আস্থা একবার ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ অর্থনীতির ভিত্তি শুধু অর্থ নয়; বিশ্বাসও একটি বড় উপাদান। যদি মানুষ মনে করে বাজারে নিয়মের চেয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য বেশি, তাহলে তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাবে।

একটি সুস্থ শেয়ারবাজার শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটি তখনই সম্ভব, যখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা যাবে।

বিদেশে টাকা পাচার এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম আলোচিত ও উদ্বেগজনক বিষয়। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে বিদেশে চলে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষণায় উঠে এসেছে। এই অর্থ যদি দেশে বিনিয়োগ হতো, তাহলে শিল্প গড়ে উঠতে পারত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো এবং অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হতে পারত।

টাকা পাচারের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো- এটি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। সাধারণ মানুষ যখন দেখে একদিকে তাকে কর দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অবাধে অর্থ বিদেশে পাচার করছে, তখন তার মনে প্রশ্ন জাগে- রাষ্ট্র কি সবার জন্য সমান?

অর্থনীতি শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি নৈতিকতারও বিষয়। একটি সমাজে যদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হয় না। বহুতল ভবন, উড়ালসড়ক বা বড় বড় প্রকল্প উন্নয়নের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু যদি সেই উন্নয়নের ভেতরে বৈষম্য, দুর্নীতি ও লুটপাট লুকিয়ে থাকে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলে।

আমাদের দেশে অর্থনীতির আলোচনা অনেক সময় অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে। এতে সাধারণ মানুষ বিচ্ছিন্ন বোধ করে। অথচ অর্থনীতির মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। তাই অর্থনীতিবিদদের উচিত এমন ভাষায় কথা বলা, যা জনগণ সহজে বুঝতে পারে।

যদি একজন অর্থনীতিবিদ জনগণকে বোঝাতে পারেন কেন ঋণখেলাপি রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর, কেন ব্যাংক দুর্বল হলে বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ে, কেন টাকা পাচার হলে কর্মসংস্থান কমে- তাহলে জনগণও অর্থনৈতিক সংস্কারের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেবে।

গণমাধ্যমেরও এখানে বড় ভূমিকা রয়েছে। শুধু জটিল পরিসংখ্যান প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অনিয়ম তুলে ধরা জরুরি। জনগণ জানতে চায়- কারা ব্যাংক লুট করছে, কারা টাকা পাচার করছে, কারা শেয়ারবাজারে কারসাজি করছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চায়, তাহলে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বড় অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে জনগণের আস্থা ফিরবে না।

অর্থনৈতিক বৈষম্যও এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। একদিকে সীমিত আয়ের মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে জীবনযুদ্ধে হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে অল্প কিছু মানুষের বিপুল সম্পদ বৃদ্ধির খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন অবশ্যই বাস্তব। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের সুফল যদি ন্যায্যভাবে বণ্টিত না হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন নিয়ে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হবে।

অর্থনীতির পণ্ডিতদের দায়িত্ব শুধু সরকারের প্রশংসা করা নয়, বরং প্রয়োজনীয় সমালোচনা ও সতর্কবার্তা দেওয়া। একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবী বা গবেষক রাষ্ট্রের শুভাকাঙ্ক্ষী হন। তিনি সমস্যাকে আড়াল করেন না; বরং সমাধানের পথ দেখান।

আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন সাহসী ও বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক আলোচনা। এমন আলোচনা, যেখানে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও কষ্টের প্রতিফলন থাকবে। এমন আলোচনা, যেখানে ঋণখেলাপি ও দুর্নীতিকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার করা হবে। এমন আলোচনা, যেখানে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হবে।

জাতি তখনই উপকৃত হবে, যখন অর্থনীতির ভাষা হবে জনগণের ভাষা। যখন গবেষণাগারের পরিসংখ্যান মাঠের মানুষের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হবে। যখন অর্থনীতিবিদরা শুধু আন্তর্জাতিক সংস্থার সূচক নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনের সংকট নিয়েও সমান গুরুত্ব দিয়ে কথা বলবেন।

কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয়, যখন জনগণ অনুভব করে- এই অর্থনীতি তাদেরও। শুধু কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নয়, বরং পুরো জাতির কল্যাণের জন্যই রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রশ্নের ওপর- আমরা কি লুটপাট, পাচার ও বৈষম্যের অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির পথে এগোতে পারব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক: কবি, লেখক ও কলামিস্ট
bbqif1983@gmail.com

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button