গভীর রাতে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সন্ত্রাসী হামলা

মুহাম্মদ জুবাইর: ৪২ মামলার আসামি ইয়াসিন-ফারুক বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ , বাড়ছে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র ও দখল বাণিজ্য , এলাকাবাসীর প্রশ্ন,কেন ধরা পড়ছে না শীর্ষ সন্ত্রাসীরা?
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুর আবারও রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। গভীর রাতে যৌথ বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রবিবার (২৪ মে) দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী অতর্কিতভাবে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করলে পাল্টা জবাব দেয় র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চলা এ গোলাগুলিতে পুরো পাহাড়ি জনপদ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গভীর রাতে হঠাৎ পাহাড়ের বিভিন্ন দিক থেকে একের পর এক গুলির শব্দ শোনা যায়। আতঙ্কে ঘর থেকে বের হতে পারেননি সাধারণ মানুষ। নারী ও শিশুদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে মাটিতে শুয়ে রাত কাটান। পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
র্যাব–৭ চট্টগ্রামের কমান্ডিং কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে আসা ৪২ মামলার আসামি ইয়াসিন-ফারুক গ্রুপ যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে। রাত ১টার দিকে সন্ত্রাসীরা ক্যাম্প ঘিরে গুলিবর্ষণ শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা নন-লেথাল অস্ত্র ব্যবহার করে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী উভয়পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
তিনি আরও বলেন, গোলাগুলির পর যৌথ বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে অভিযান শুরু করে। পাহাড়ি বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। বর্তমানে পুরো এলাকা নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখন পর্যন্ত হতাহত কিংবা কাউকে আটকের তথ্য পাওয়া না গেলেও সন্ত্রাসীদের অবস্থান শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সরকারি খাসজমি দখল করে বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ বসতি, দোকানপাট, মার্কেট ও বহুতল ভবন। পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি।
ভূমি অফিস সূত্র জানায়, প্রায় তিন হাজার ১০০ একর সরকারি জমি নিয়ে গড়ে ওঠা এ এলাকায় গত চার দশক ধরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আধিপত্য চলে আসছে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া, অবৈধ দখল ও অস্ত্রের শক্তিতে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে এসব বাহিনী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জঙ্গল সলিমপুর এখন অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই সেখানে বাড়ছে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র কারবার, অপহরণ, ছিনতাই, জমি দখল ও নির্যাতনের ঘটনা। সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করেন। ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, ইয়াসিন ও ফারুক বাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা থাকলেও তারা এখনও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রশাসনের চোখের সামনে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
গত ১৯ জানুয়ারি একই জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন র্যাবের উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন। ওই ঘটনায় আরও তিন র্যাব সদস্য ও একজন সোর্স আহত হন। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও এখন পর্যন্ত মূল আসামিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর র্যাবের পক্ষ থেকে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা দায়ের করা হয়। এরপর যৌথ বাহিনী এলাকায় একাধিক অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের মুখে সন্ত্রাসীরা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হারালেও পুরো এলাকা এখনও তাদের প্রভাবমুক্ত হয়নি। সাম্প্রতিক হামলা আবারও প্রমাণ করেছে, জঙ্গল সলিমপুরে এখনও শক্তিশালী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমি, কারাগারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এলাকাকে সন্ত্রাসমুক্ত করে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব, অবৈধ স্থাপনা ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আধিপত্যের কারণে উন্নয়ন কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রশাসনের একাধিক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও পুরো এলাকা এখনও দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ায় সন্ত্রাসীরা সহজেই গোপন আস্তানা তৈরি করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ফলে অভিযান পরিচালনা করেও অনেক সময় তাদের গ্রেফতার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জঙ্গল সলিমপুরে প্রতিনিয়ত বাড়ছে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, অস্ত্রের মহড়া ও দখলবাণিজ্য। বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, চাঁদা না দিলে ব্যবসা পরিচালনা করা যায় না। পাহাড়ি এলাকায় নতুন ঘর নির্মাণ, দোকান খোলা কিংবা জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রেও সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর কিংবা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
এছাড়া পাহাড়ি বিভিন্ন পয়েন্টে মাদক ব্যবসা ও অস্ত্র বেচাকেনার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, জঙ্গল সলিমপুর এখন অপরাধীদের নিরাপদ ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো জঙ্গল সলিমপুর এলাকায়। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিনিয়ত গুলির শব্দ, সন্ত্রাসীদের মহড়া ও চাঁদাবাজির কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। স্থায়ীভাবে সন্ত্রাস দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, পাহাড়ি এলাকায় নিয়মিত টহল বৃদ্ধি, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং ইয়াসিন-ফারুকসহ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেফতার ছাড়া জঙ্গল সলিমপুরে শান্তি ফিরবে না।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অপরাধ সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।



