অপরাধদুর্নীতি

সোনারগাঁয়ে ড্রেজিংয়ের আড়ালে বালু লুট: প্রতি রাতে হাতবদল অর্ধকোটি টাকা

মোঃ মোক্তার হোসাইন: নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বারদী-বৈদ্যের বাজার নৌপথের মেঘনা নদীতে নদীর নাব্যতা রক্ষার নামে পরিচালিত ড্রেজিং কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কোটি টাকার অবৈধ বালু বাণিজ্যের অভিযোগ।

স্থানীয়দের দাবি, সরকারি অনুমোদনের আড়ালে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গভীর রাতে নদী থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করে বাল্কহেডের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিদিন রাত ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে অন্তত ২০ থেকে ২৫টি লোডিং ড্রেজারের মাধ্যমে ৫০ থেকে ৬০টি বাল্কহেডে বালু তোলা হয়। প্রতিটি বাল্কহেডে ১৫ থেকে ৩৫ হাজার ঘনফুট পর্যন্ত বালু পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে।

সে হিসাবে প্রতি রাতেই প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এসব বালু বিক্রির মাধ্যমে প্রতি রাতে হাতবদল হচ্ছে অর্ধকোটিরও বেশি টাকা।

স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী আনন্দবাজার হাট। সরকার প্রতিবছর এই হাট থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আয় করে। এছাড়া হাটসংলগ্ন দুটি বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানও নদীভাঙনের আশঙ্কায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ও হাটকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা নির্ভরশীল।

জানা যায়, গত ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে উপজেলা ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় ড্রেজিংকৃত মাটি অপসারণের লক্ষ্যে একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে আবেদনকারী মমিনুল মোমেন সিকদারের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী খামারগাঁও মৌজার নির্ধারিত স্থানে মাটি ফেলার কথা ছিল। এ জন্য সুরক্ষা বাঁধ (প্রোটেকশন ওয়াল) নির্মাণ এবং প্রশাসনিক তদারকির শর্তও আরোপ করা হয়েছিল।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে এসব শর্তের কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং ড্রেজিংয়ের আড়ালে নদী থেকে সরাসরি বালু উত্তোলন করে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় জেলেরা। মাছ ধরার জাল, চাঁই ও অন্যান্য সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও হুমকির মুখে পড়ছে বলে দাবি তাদের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ-পুলিশের ইনচার্জ মাহবুব সাংবাদিকদের বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে পরে জানাবো।” তবে পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম সারোয়ার বলেন, বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জানলাম। এটি মূলত বিআইডব্লিউটিএ’র তদারকির বিষয়।

এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নদী রক্ষার নামে যদি নদী থেকেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়, তাহলে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব কোথায় যাচ্ছে? কারা নিয়ন্ত্রণ করছে এই বালু সিন্ডিকেট? আর কেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় নদীভাঙন, পরিবেশ বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি আরও বাড়বে।

(চলবে — দ্বিতীয় পর্বে থাকছে: কারা রয়েছে এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে, কোথায় যাচ্ছে প্রতিরাতের বিপুল অর্থ এবং কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে পুরো বালু বাণিজ্য চক্র।)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button