কেন সবাই ধনী হয় না? মুসা (আঃ) ও এক ভিক্ষুকের জীবনের সেই ঐতিহাসিক শিক্ষা
ইসলামিক ডেস্ক: মানুষের মনে প্রায়ই একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগে—আল্লাহ তায়ালা কেন সবাইকে সমান ধনী বা সচ্ছল বানান না? জগতের এই বিচিত্র রিযিক বণ্টনের পেছনে যে নিগূঢ় প্রজ্ঞা লুকিয়ে আছে, তা ফুটে উঠেছে হযরত মুসা (আঃ)-এর জীবনের এক ঘটনা এবং পারস্যের প্রখ্যাত মহাজ্ঞানী আল্লামা শেখ সাদী (রহ.)-এর দর্শনে।
ইসলামী ইতিহাসে বর্ণিত আছে, হযরত মুসা (আঃ) একবার পথ চলার সময় এক চরম অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখতে পান। লোকটির দারিদ্র্য এতটাই প্রকট ছিল যে, পরনে কোনো কাপড় না থাকায় সে লজ্জায় বালুর নিচে নিজের শরীর লুকিয়ে রেখেছিল। আল্লাহর নবীকে দেখে সে আর্তনাদ করে বলল, “হে নবী! আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আমাকে বেঁচে থাকার মতো সামান্য রিযিক দান করেন। অভাবের এই তীব্র যন্ত্রণা আমি আর সহ্য করতে পারছি না।”
দয়ালু নবী মুসা (আঃ) লোকটির করুণ দশায় ব্যথিত হয়ে আল্লাহর দরবারে তার সচ্ছলতার জন্য প্রার্থনা করলেন। মহান আল্লাহ তাঁর নবীর দোয়া কবুল করলেন। কিছুদিন পর সেই পথ দিয়ে ফেরার সময় মুসা (আঃ) দেখলেন মানুষের এক বিশাল ভিড়। কৌতূহলী হয়ে কারণ জানতে চাইলে স্থানীয়রা জানাল, “কিছুদিন আগে সেই বালুর নিচে পড়ে থাকা চরম দরিদ্র লোকটি হঠাৎ অঢেল সম্পদের মালিক হয়। কিন্তু সম্পদ পেয়েই সে বিপথে চালিত হয় এবং মদ্যপান করে মাতলামি শুরু করে। এক পর্যায়ে সে একজনকে হত্যা করে ফেলে। এখন খুনের অপরাধে তার মৃত্যুদণ্ড (কিসাস) কার্যকর করার প্রস্তুতি চলছে।”
এই দৃশ্য দেখে হযরত মুসা (আঃ) স্তম্ভিত হয়ে গেলেন এবং মহান আল্লাহর গভীর প্রজ্ঞা উপলব্ধি করলেন। তিনি নিজের পূর্বের আবদারের জন্য লজ্জিত হয়ে তওবা পাঠ করলেন।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি উল্লেখ করে আল্লামা শেখ সাদী (রহ.) কয়েকটি চমৎকার রূপক উপমা দিয়েছেন:
১. অত্যাচারী হওয়ার সম্ভাবনা: তিনি বলেন, বেচারা বিড়ালের যদি ডানা থাকত, তবে সে দুনিয়ার সব চড়ুই পাখির বংশ নির্বংশ করে দিত। অর্থাৎ, অনেক সময় দুর্বলরা শক্তি বা সম্পদ পেলে তা অন্যের ওপর জুলুমের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
২. পিঁপড়ার পাখা: গ্রিক দার্শনিক আফলাতুন (প্লেটো)-এর একটি উক্তি উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, পিঁপড়ার পাখা না থাকাই ভালো; কারণ পাখা গজালে সে অহংকারে উড়ে বেড়াবে এবং দ্রুত নিজের ধ্বংস ডেকে আনবে।
৩. কুরআনের অমিয় বাণী: পবিত্র কুরআনের সূরা শুরার ২৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন: “যদি আল্লাহ তাঁর সব বান্দাকে অঢেল রিযিক দিতেন, তবে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত।”
৪. বাবার মমতা: একজন স্নেহময় বাবা যেমন তাঁর জ্বরে আক্রান্ত সন্তানকে মধু খেতে দেন না কারণ তা ক্ষতি করতে পারে, তেমনি আল্লাহ তায়ালাও জানেন কোন বান্দার জন্য কতটুকু সম্পদ কল্যাণকর।
যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তিনি আমাদের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমাদের চেয়েও বেশি অবগত। অনেক সময় অভাবও মানুষের জন্য এক ধরণের সুরক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। তাই নিজের অবস্থার ওপর সন্তুষ্ট থেকে (কানা’আত) আল্লাহর ফয়সালাকে মেনে নেওয়াই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। কারণ আল্লাহ যাকে ধনী করেননি, তার ভালো-মন্দ তিনি নিজেই সবচেয়ে ভালো জানেন।



