জীবন সায়াহ্নে নতুন সুর: বয়স্ক পুরুষদের পুনর্বিবাহের সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

ইদ্রিস ভূঁইয়া আল মাদানী
লেখক ও কলামিস্ট
জীবনের শেষ বাঁকে এসে মানুষ যখন থমকে দাঁড়ায়, তখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় এক চিলতে উষ্ণতা ও একজন অনুগত সঙ্গীর। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে—এমনকি আমাদের সমাজেও—বয়স্ক পুরুষদের পুনর্বিবাহ বা নতুন করে সংসার শুরু করার প্রবণতা চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। বিষয়টিকে একসময় সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুটা সঙ্কুচিত চোখে দেখা হলেও, বর্তমান জনমিতিক পরিবর্তন, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার আলোকেও এটি এখন আর কোনো ‘বিলাসিতা’ নয়; বরং জীবন ধারণের এক অপরিহার্য মানবিক চাহিদা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কেন জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে অনেকে নতুন করে জীবনসঙ্গী বেছে নিচ্ছেন? এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক পরিবর্তন, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত।
১. ‘এম্পটি নেস্ট সিন্ড্রোম’ ও মানসিক নিঃসঙ্গতা
সন্তানরা বড় হয়ে নিজ নিজ ক্যারিয়ার, সংসার বা পড়াশোনার সূত্রে আলাদা হয়ে যাওয়া কিংবা বিদেশে পাড়ি জমানো—আধুনিক নগরায়ণের খুব স্বাভাবিক চিত্র। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘এম্পটি নেস্ট সিন্ড্রোম’ (Empty Nest Syndrome)।
- তথ্য ও পরিসংখ্যান: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে প্রায় ৩০-৪০% তীব্র একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতায় ভোগেন।
- বাস্তবতা: জীবনসঙ্গীর বিয়োগের পর এই নিঃসঙ্গতা বিষাদ ও অবসাদে রূপ নেয়। সন্তান বা নাতি-নাতনিরা কখনোই একজন সমবয়সী বা আবেগীয় সঙ্গীর বিকল্প হতে পারে না। প্রতিদিনের ছোটখাটো অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার আদান-প্রদানের জন্য তারা একজন সার্বক্ষণিক সঙ্গীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
২. দীর্ঘায়ু বৃদ্ধি ও ‘অ্যাক্টিভ অ্যাজিং’ (Active Aging)
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে মানুষের গড় আয়ু বহুগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৭২ বছরের উপরে, যা বিগত কয়েক দশকের তুলনায় অনেক বেশি।
- শারীরিক সক্ষমতা: আজ ষাট বা সত্তোরোর্ধ্ব অনেক পুরুষই আগের চেয়ে অনেক বেশি কর্মক্ষম ও শারীরিক-মানসিকভাবে সুস্থ থাকেন।
- জীবনের নতুন অধ্যায়: অবসর গ্রহণের পর তাদের সামনে একটি দীর্ঘ সময় খালি থাকে। উন্নত জীবনযাত্রার কারণে শরীর ভালো থাকায় এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব (পেনশন, সঞ্চয় বা নিজস্ব সম্পত্তি) থাকায় তারা নিঃসঙ্গ জীবন না কাটিয়ে জীবনকে ইতিবাচকভাবে উপভোগ করার পথ বেছে নেন।
৩. বিবাহ ও শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যের বৈজ্ঞানিক যোগসূত্র
বার্ধক্যে সঙ্গীর সান্নিধ্য কেবল আবেগীয় বিষয় নয়, এর প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর।
- গবেষণার তথ্য: জার্নাল অফ আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন-এর এক গবেষণা অনুযায়ী, একা থাকা বা সঙ্গীহীন মানুষদের তুলনায় বিবাহিত বা সঙ্গীর সঙ্গে থাকা প্রবীণদের হৃদরোগের ঝুঁকি এবং স্ট্রোক পরবর্তী মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
- আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ: একা থাকার ফলে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও সঙ্গীর উপস্থিতি প্রবীণদের স্মরণশক্তি লোপ পাওয়া (Dementia) এবং আলঝেইমারের ঝুঁকি প্রায় ৩০-৪০% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।
৪. পারিবারিক পরনির্ভরশীলতা হ্রাস ও পরিচর্যার বাধ্যবাধকতা
বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা আর্থ্রাইটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।
- পরিচর্যার সঠিক উৎস: সঠিক সময়ে ওষুধ গ্রহণ, সঠিক খাদ্যভ্যাস এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য প্রবীণদের সার্বক্ষণিক পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। পেশাদার নার্স বা গৃহপরিচারক দিয়ে সেবা পাওয়া গেলেও, তার মধ্যে আবেগীয় সহানুভূতি থাকে না।
- স্বাবলম্বিতা: সন্তান বা পুত্রবধূর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে একজন সঙ্গীর সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের জীবন পরিচালনা করাকে অনেকে বেশি সম্মানজনক ও স্বস্তিদায়ক মনে করেন।
৫. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা
ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের সমাজে প্রবীণদের পুনর্বিবাহকে কিছুটা নেতিবাচকভাবে দেখা হতো। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তার, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং একক পরিবারের (Nuclear Family) আধিক্যের কারণে এই ধারনায় পরিবর্তন এসেছে।
- সামাজিক নিরাপত্তা: অনেক ক্ষেত্রে বয়স্ক পুরুষ যেমন সঙ্গীর অভাব বোধ করেন, তেমনি অনেক একক, বিধবা বা বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া নারীও জীবনের শেষভাগে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা খোঁজেন। ফলে উভয়ের পারস্পরিক সম্মতিতে এটি একটি ইতিবাচক সামাজিক সমঝোতায় রূপ নেয়।
শেষ কথা: দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সময় এখনই
বার্ধক্যে নতুন বিয়ে কোনো সামাজিক লজ্জা বা কৌতুহলের বিষয় নয়। জীবনচক্রের প্রতিটি পর্যায়েই মানুষের ভালোবাসার, আশ্রয়ের এবং সহমর্মিতার প্রয়োজন রয়েছে। একাকীত্বের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে জীবনের শেষ চ্যাপ্টারটি শান্তিতে ও আনন্দের সাথে অতিক্রম করার এই অধিকার প্রতিটি প্রবীণ মানুষেরই রয়েছে।
পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বিষয়টিকে ট্যাবু হিসেবে না দেখে, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে এটি সহানুভূতিশীল ও ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাই হোক আধুনিক সমাজের পরিচয়।



