নাঈম হাসান নির্যাতন পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা, ওসি প্রত্যাহার, তদন্তে নেমেছে সিএমপি

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফেরার পথে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অফস্পিনার নাঈম হাসানকে মারধর ও থানায় নিয়ে গিয়ে হেনস্তার ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ক্রীড়াঙ্গন, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর খুলশী থানার দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আলোচিত এই ঘটনার জেরে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমানকেও দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। শনিবার দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর নির্দেশে ওসি আরিফুর রহমানকে খুলশী থানা থেকে প্রত্যাহার করে দামপাড়া পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। তাঁর স্থলে বাকলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ সোলাইমানকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সিএমপির মুখপাত্র ও সহকারী পুলিশ কমিশনার (পিআর) আমিনুর রশিদ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে খুলশী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার গভীর রাতে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে প্রাইম ব্যাংকের হয়ে ম্যাচ খেলে রাজধানী ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরেন জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসান। ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। বিমানবন্দর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে চান্দগাঁওয়ের বাসায় ফিরছিলেন নাঈম। পথিমধ্যে নগরীর লালখান বাজার ফ্লাইওভারের নিচে তাঁর বহনকারী অটোরিকশার গতিরোধ করে পুলিশের একটি দল। নাঈম হাসানের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে অটোরিকশার চালকের কাগজপত্র দেখতে চাওয়া হয়। এরপর তাঁকে গাড়ি থেকে নামতে বলা হয়। তিনি কারণ জানতে চাইলে পুলিশ সদস্যরা তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। তিনি নিজেকে জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় হিসেবে পরিচয় দেন এবং পরিচয়পত্র দেখান। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। নাঈমের দাবি, খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম তাঁকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। শুধু তাই নয়, পুলিশের সোর্স পরিচয়ে থাকা এক ব্যক্তি পাইপ দিয়ে তাঁকে মারধর করেন। মারধরের সময় তিনি বারবার নিজের পরিচয় দিলেও কেউ তা আমলে নেয়নি।
ঘটনার সময় আশপাশে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকে নাঈম হাসানকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে শনাক্ত করে পুলিশকে বিষয়টি জানান। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এরপরও অভিযুক্তরা মারধর বন্ধ করেননি। বরং তাঁকে ‘আসামি’ বলে চুপ থাকতে বলা হয়।
নাঈম হাসান বলেন, “ঘটনাস্থলে ১০০ থেকে ২০০ মানুষ জড়ো হয়েছিল। তারা সবাই আমাকে চিনেছে। অনেকেই বলেছে আমি জাতীয় দলের ক্রিকেটার। কিন্তু তারপরও তারা আমাকে মারধর করেছে। আমাকে বারবার বলা হয়েছে, তুই আসামি, চুপ থাক।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে তাঁকে অন্য একটি অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে তাঁকে খুলশী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ওসির কক্ষেও তাঁকে অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
নাঈমের ভাষ্য অনুযায়ী, থানায় নিয়ে যাওয়ার পর ওসি আরিফুর রহমান প্রথমে তাঁর সঙ্গে কঠোর আচরণ করেন। তিনি যখন ঘটনার বিবরণ দিতে চেষ্টা করছিলেন, তখন ওসি তাঁকে চোখ নিচু করে কথা বলতে বলেন। তবে পরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহল থেকে ফোন আসতে শুরু করলে পরিস্থিতি বদলে যায় এবং আচরণেও পরিবর্তন দেখা যায়।
নাঈম আরও জানান, অটোরিকশা থেকে নামানোর সময় তাঁর মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে থানায় ফোন ফেরত পাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি তামিম ইকবালকে বিষয়টি জানান। এরপর বিসিবির পরিচালক ইসরাফিল খসরুসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তিনি বলেন, “আজ আমার পরিচয় আছে বলে অনেক মানুষ এগিয়ে এসেছে। কিন্তু প্রতিদিন সাধারণ মানুষের সঙ্গে যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ থাকে না। আমি চাই সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করা হোক।” ঘটনার খবর পেয়ে রাতেই খুলশী থানায় যান নাঈমের বাবা চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির নেতা মাহবুবুল আলম। তিনি অভিযোগ করেন, থানায় গিয়েও তিনি যথাযথ সহযোগিতা পাননি। বরং ডিউটি কর্মকর্তার অসৌজন্যমূলক আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। মাহবুবুল আলম বলেন, “আমার ছেলেকে বিনা কারণে মারধর করা হয়েছে। একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার যদি এমন আচরণের শিকার হন, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা করব। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
ঘটনার পর মধ্যরাতে থানায় ভিড় করেন নাঈমের স্বজন, প্রতিবেশী, ক্রীড়াপ্রেমী ও সাধারণ মানুষ। তারা অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল চৌধুরী এবং পুলিশের সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মারধর, বেআইনি আটকে রাখা এবং অপহরণের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একটি নির্দিষ্ট সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চোরাচালানের মালামাল বহনের গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। জানা গেছে, ছুটিতে ঢাকায় অবস্থানরত খুলশী থানার এসআই মনিরুল ইসলাম একটি গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে তথ্যটি দিয়েছিলেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ওই তথ্যের যথার্থতা যাচাই না করেই অভিযান চালানো হয়েছিল কি না, সেটিও এখন তদন্তের অন্যতম বিষয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একজন ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরও কেন তাঁকে মারধর করা হলো এবং কেন তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেছেন, ঘটনাটির প্রতিটি দিক তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পুলিশের কেউ যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “পুলিশের ভাবমূর্তির সঙ্গে বিষয়টি জড়িত। আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে আছি।” প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর এসআই শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও কনস্টেবল রাসেল চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অভিযানে থাকা আরও এক কনস্টেবলকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশের সোর্স সোহেলকেও আটক করা হয়েছে।
ঘটনার পর শনিবার দুপুরে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী নাঈম হাসানের চান্দগাঁওয়ের বাসায় যান। সেখানে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। অন্যদিকে ওসি আরিফুর রহমানকে ঘিরেও নানা অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, মানবাধিকারকর্মী এবং সচেতন নাগরিকদের একাংশের দাবি, অতীতেও তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক হয়রানি এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন এবং বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় তাঁর নাম আলোচিত হয়েছিল। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন এবং তাঁর কিছু ঘনিষ্ঠ সোর্সের মাধ্যমে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন। স্থানীয় পর্যায়ে ‘ইয়াবা বাবলু’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তির নামও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি এবং সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার যদি পরিচয় দেওয়ার পরও পুলিশের মারধরের শিকার হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা কোথায়?
সচেতন নাগরিকদের মতে, শুধু সাময়িক বরখাস্ত বা প্রত্যাহার নয়, ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন সামাজিক ও ক্রীড়া সংগঠনের নেতারাও এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, নাঈম হাসানের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, হয়রানি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সব মিলিয়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধর ও হেনস্তার ঘটনা এখন চট্টগ্রামসহ সারাদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এসআই ও কনস্টেবলদের সাময়িক বরখাস্ত, পুলিশের সোর্স আটক এবং শেষ পর্যন্ত ওসি আরিফুর রহমানের প্রত্যাহার এই ঘটনার গুরুত্বই স্পষ্ট করেছে। এখন সবার দৃষ্টি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে। তদন্তে প্রকৃত সত্য কী উঠে আসে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই দেখার অপেক্ষা।



