দেশ

সম্পত্তির লোভে বাবাকে হত্যা: প্রেমের ফাঁদ পেতে ছেলের ভয়ংকর পরিকল্পনা

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রামে সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রেমের ফাঁদ পেতে নিজ বাবাকে হত্যা করার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রায় দুই বছর আগে নিখোঁজ হওয়া বাবুর্চি মীর মজিবুর রহমান খানের (৬০) রহস্যজনক অন্তর্ধানের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে রোমহর্ষক হত্যার কাহিনি। পিবিআইয়ের তদন্তে জানা গেছে, পৈত্রিক সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে প্রথম স্ত্রীর ছেলে বেলাল হোসেন পরিকল্পিতভাবে বাবাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। হত্যার পর মরদেহ জঙ্গলে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় তারা। পরে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা সেই মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করে মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে পিবিআই।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৬ জুন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে কোতোয়ালী থানাধীন আন্দরকিল্লা এলাকায় মেয়ের বাসায় বেড়াতে আসেন মীর মজিবুর রহমান খান। মেয়ের বাসায় একদিন অবস্থানের পর ৭ জুন সকালে একটি নারীর ফোনকল পান তিনি। ফোনকল পাওয়ার পর বাঁশখালী যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে যান। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

বাবার রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তার মেয়ে সালমা খানম দীর্ঘদিন খোঁজাখুঁজির পর ২০২৪ সালের ৮ জুলাই কোতোয়ালী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। কিন্তু তাতেও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় একই বছরের ৬ নভেম্বর চট্টগ্রামের আদালতে অপহরণের অভিযোগে একটি সিআর মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পায় পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো।

তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তারা তথ্যপ্রযুক্তি, কল রেকর্ড বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মামলাটির গভীরে অনুসন্ধান শুরু করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ে ভিকটিমের ছেলে বেলাল হোসেনের দিকে।

গত ১৩ জুন বিকেলে কর্ণফুলী থানার মইজ্জারটেক এলাকা থেকে বেলাল হোসেনকে গ্রেফতার করে পিবিআই। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা হালিশহর থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, নিখোঁজ হওয়ার সময়ের কাছাকাছি সময়ে অজ্ঞাত পরিচয়ের একটি মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়।

বেলালের দেওয়া তথ্য ও অন্যান্য আলামত যাচাই-বাছাই করে পিবিআই নিশ্চিত হয় যে, বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা মরদেহটি আসলে নিখোঁজ মীর মজিবুর রহমান খানের। প্রায় দুই বছর পর নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত হওয়ায় মামলার তদন্তে নাটকীয় অগ্রগতি আসে।
এরপর বেলালের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৪ জুন ভোরে চট্টগ্রামের জোরারগঞ্জ থানার ঘেড়ামারা গ্রামে অভিযান চালিয়ে তার সহযোগী আব্দুল জলিলকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর বেলাল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে এবং পুরো হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেয়।

পিবিআই সূত্রে জানা যায়, সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাবার সঙ্গে বেলালের বিরোধ চলছিল। বেলাল মনে করত, তার বাবা তাকে পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করছেন এবং বাকি সম্পত্তিও বিক্রি করে দিতে পারেন। এ কারণে সে বাবাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এক পরিচিত নারীর মাধ্যমে মীর মজিবুর রহমান খানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করা হয়। ওই নারীকে ব্যবহার করে ধীরে ধীরে ভিকটিমকে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে ফেলা হয়। ঘটনার দিন ৭ জুন ২০২৪ সালে ওই নারীর বাসায় ডেকে নেওয়া হয় মীর মজিবুর রহমানকে।

সেখানে তাকে শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাওয়ানো হয়। শরবত পান করার কিছু সময় পর তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর বেলাল হোসেন ও তার সহযোগী আব্দুল জলিল অচেতন অবস্থায় তাকে হালিশহর এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। হত্যার পর মরদেহ একটি নির্জন জঙ্গল এলাকায় ফেলে রেখে তারা পালিয়ে যায়।

পরে স্থানীয়ভাবে অজ্ঞাত পরিচয়ের মরদেহ উদ্ধার হলেও পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় সেটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। এভাবেই প্রায় দুই বছর হত্যার রহস্য চাপা পড়ে ছিল। কিন্তু পিবিআইয়ের ধারাবাহিক তদন্ত, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে অবশেষে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কাহিনি।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাটিতে ব্যবহৃত নারীসহ অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হত্যার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে আরও কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পিবিআই বলছে, এটি শুধু একটি নিখোঁজ ব্যক্তির মামলা ছিল না; বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের একটি জটিল রহস্য, যা দীর্ঘ সময় পর সফল তদন্তের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে। বর্তমানে মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button