আইন-শৃঙ্খলাচট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে বিষ খেয়ে ভাইরাল সেই সুমন ঘোষের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাকেন্দ্র খাতুনগঞ্জে দীর্ঘদিনের জমি ও দোকান ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মানহানিকর পোস্ট, প্রতারণা, বিষ পান ,ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অপপ্রচারের অভিযোগে সাবেক ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড বকশিরহাট কোতোয়ালী ইউনিট যুবলীগের সভাপতি সুমন ঘোষ ও তার স্ত্রী মেরী ঘোষের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের আদালতে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনায় ব্যবসায়ী মহলসহ স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রামের মাননীয় চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়েরকৃত সি.আর. মামলা নং-১৯১২/২০২৬-এর বাদী মো. শাহাদাৎ আলী (৬০)। তিনি খাতুনগঞ্জ এলাকার হাজী আছদ আলী সওদাগরের বাড়ির বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় ১নং আসামি করা হয়েছে সুমন ঘোষকে এবং ২নং আসামি করা হয়েছে তার স্ত্রী মেরী ঘোষকে। অভিযোগে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৫০০, ৫০১ ও ৪২০ ধারাসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ধারার উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার আরজিতে বাদী দাবি করেন, তিনি একজন শান্তিপ্রিয়, আইনমান্যকারী ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। অপরদিকে আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বেআইনি কর্মকাণ্ড, প্রতারণামূলক আচরণ এবং হয়রানিমূলক কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত বলে তিনি অভিযোগ করেন।
মামলার নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় তিন দশক আগে অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে স্বপন ঘোষ এন্ড সন্স নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাদীর কাছ থেকে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা শুরু করে। পরবর্তীতে উভয় পক্ষের মধ্যে লিখিত চুক্তির ভিত্তিতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চলতে থাকে। তবে সময়ের পরিক্রমায় দোকানের জায়গা, মালিকানা এবং দখল সংক্রান্ত বিষয়ে বিরোধ দেখা দেয়। এ বিরোধের জেরে বাদীপক্ষ ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল এবং যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালত, চট্টগ্রামে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল মামলা নং-১৩১৫৮/২৫ দায়ের করে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

বাদীপক্ষের অভিযোগ, চলমান মামলার প্রভাব খাটিয়ে এবং তাদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে ১৯ জুন ২০২৬ তারিখ ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে ১নং আসামি সুমন ঘোষ তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে বাদী শাহাদাৎ আলী, তার ভাই সমশের আলী এবং আইয়ুব আলীর ছবি ব্যবহার করে একটি পোস্ট প্রকাশ করেন। ওই পোস্টে তাদের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ আনা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়ে যায়। এর ফলে বাদী ও তার পরিবারের সদস্যরা সামাজিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। আত্মীয়-স্বজন, ব্যবসায়িক অংশীদার, পরিচিতজন এবং স্থানীয়দের মধ্যে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। বাদীপক্ষ দাবি করেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের ‘চাঁদাবাজ’ হিসেবে উপস্থাপন করে সামাজিক ও ব্যবসায়িক সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে।

ঘটনার পরপরই বাদীপক্ষ আইনি সহায়তা গ্রহণের উদ্যোগ নেয় এবং কোতোয়ালী থানায় পৃথক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নং-১৬২৪ ও ১৬২৭, তারিখ ১৯ জুন ২০২৬, দায়ের করে। এসব জিডিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্ট এবং তার প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা যায়।

মামলার আরজিতে আরও বলা হয়েছে, ১নং আসামি কারাগারে থাকা অবস্থায় ২নং আসামি মেরী ঘোষ বাদীপক্ষের অজান্তে ২৫ আগস্ট ২০২৫ তারিখে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি দোকান ভাড়ার চুক্তিপত্র সম্পাদন করেন। পরে ওই চুক্তিপত্র আদালতে জামিনের আবেদন ও অন্যান্য আইনি কার্যক্রমে ব্যবহার করা হলেও বিষয়টি সম্পর্কে বাদীপক্ষকে আগে অবহিত করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বাদীপক্ষের দাবি, এ ঘটনাও তাদের সঙ্গে প্রতারণার অংশ এবং এর মাধ্যমে একটি ভিন্ন আইনি অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তারা বিস্মিত হন এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ১৯ জুন ঘটনার দিন সুমন ঘোষ মোবাইল ফোনে বাদীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। তিনি নাকি বাদীকে বলেন, তিনি বিষপান করে আত্মহত্যা করবেন এবং এ ঘটনার জন্য বাদী ও তার ভাইদের দায়ী করে হত্যা মামলায় আসামি করার চেষ্টা করবেন। এ ধরনের বক্তব্যে বাদীপক্ষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, পরবর্তীতে সুমন ঘোষ তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে বিষপানের একটি ভিডিও লাইভ সম্প্রচার করেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে তিনি অসুস্থ অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২১ জুন ২০২৬ তারিখ হাসপাতাল ত্যাগ করেন বলে মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাদীপক্ষের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে তাদের সামাজিক, মানসিক এবং ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে, কখনও আইনি প্রক্রিয়াকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে এবং কখনও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান জনসম্মুখে তুলে ধরতে বাদীপক্ষ সংবাদ সম্মেলনও করেছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন এবং অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

মামলার সাক্ষী হিসেবে শাহাদাৎ আলী ছাড়াও সমশের আলী, আইয়ুব আলী, আলাউদ্দিন গনি আকাশ ও নাসির সরকারসহ একাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বাদীপক্ষের দাবি, সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত হয়ে ঘটনার সত্যতা তুলে ধরবেন। এছাড়াও প্রয়োজন হলে আরও সাক্ষী উপস্থাপন করা হবে বলে মামলার আরজিতে বলা হয়েছে।

বাদীপক্ষ আদালতের কাছে অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত, আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আবেদন জানিয়েছেন। তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কারও সম্মানহানি এবং বিচারাধীন বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, যা প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন।

তবে মামলায় উত্থাপিত অভিযোগগুলো বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন বিষয়। অভিযোগের বিষয়ে আসামি সুমন ঘোষ ও মেরী ঘোষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম এবং তদন্তের অগ্রগতির ওপর মামলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button