অন্যান্যদেশবাংলাদেশসিলেট

টেবিল ছেড়ে মাঠে, বিদায়বেলায়ও অনন্য নজির গড়ে দেশজুড়ে আলোচনায় ডিসি সারওয়ার

এম এ মান্নান,সিনিয়র রিপোটারঃ বদলি বা প্রত্যাহার সরকারি চাকরিতে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

কিন্তু বিদায়ের মুহূর্তেও কেউ সাধারণ মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীর দাগ কেটে যেতে পারেন, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন সিলেটের সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম। গত রবিবার (২১ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে তাকে উপসচিব হিসেবে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে কর্মস্থল ত্যাগ করার আগে তার কিছু ব্যতিক্রমী, মানবিক ও জনবান্ধব সিদ্ধান্ত এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ পুরো দেশজুড়ে প্রশংসার ঝড় তুলছে।

​২০ হাজার টাকার জন্য কারাবন্দি চা শ্রমিক ডিসির মানবিকতায় মুক্ত আকাশ​ডিসি সারওয়ার আলমের বিদায়বেলার সবচেয়ে আলোচিত ও মানবিক উদ্যোগটি ছিল বিমানবন্দর এলাকার কেওয়াছড়া চা বাগানের কর্মচারী মঙ্গল দাসের কারামুক্তি। মাত্র ২০ হাজার টাকার বকেয়া বিদ্যুৎ বিল দিতে না পারায় গত বছরের ডিসেম্বর থেকে কারাবাস করছিলেন চা শ্রমিকের এই সন্তান।

​একপর্যায়ে কারাগার পরিদর্শনে গিয়ে মঙ্গল দাসের এই করুণ পরিস্থিতির কথা জানতে পারেন ডিসি সারওয়ার আলম এবং তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তার আশ্বাস দেন। তার হস্তক্ষেপে গত মার্চে জামিন মিললেও বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় গত ১৭ জুন পুলিশ তাকে পুনরায় গ্রেফতার করে। বিষয়টি জানতে পেরে বিদায়ের ঠিক আগমুহূর্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মঙ্গল দাসের পুরো বকেয়া বিল পরিশোধ করে দেন মো. সারওয়ার আলম। ফলে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পান এই অসহায় শ্রমিক। একজন সাধারণ শ্রমিকের পাশে ডিসির এভাবে দাঁড়ানোর বিষয়টি দেশজুড়ে দারুণভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।

​শাহজালাল (র.) মাজারে অতিরিক্ত ৫ লাখ টাকা অনুদান
​কেবল মানবিক সহায়তাই নয়, বিদায়ের প্রাক্কালে সিলেটের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আবেগের প্রতিও শ্রদ্ধা জানিয়ে গেছেন এই কর্মকর্তা। সম্প্রতি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হযরত শাহজালাল (র.) মাজারের দানবক্সে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা পাওয়া যায়। সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম তার নির্দেশনায় জেলা প্রশাসনের ফান্ড থেকে সেই টাকার সাথে আরও ৫ লাখ টাকা যুক্ত করে দেন। এর ফলে মাজারের ফান্ডে বর্তমান জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা, যা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়েছে।

​সেবার আলোয় পুণ্যভূমি কেমন ছিল ডিসি সারওয়ারের কার্যকাল?​সিলেটের প্রশাসনিক অভিভাবক হিসেবে যোগদানের পর থেকেই নিজের কর্মদক্ষতা, সততা আর অনন্য সাধারণ জনবান্ধব আচরণের মাধ্যমে আপামর জনতার হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন মো. সারওয়ার আলম। তার সুশাসনে বদলে গেছে সিলেটের চেনা প্রশাসনিক চিত্র।
​উন্মুক্ত জনতার দুয়ার আমলাতান্ত্রিক জটিলতার দেয়াল ভেঙে তিনি সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দিয়েছিলেন জেলা প্রশাসনের দ্বার। ফলে যেকোনো সাধারণ নাগরিক অনায়াসে সরাসরি ডিসির কাছে গিয়ে অভাব-অভিযোগের কথা জানাতে পারতেন।

​দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স জেলা প্রশাসনের যেকোনো স্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। ঘুষ ও হয়রানিমুক্ত প্রশাসন গড়তে নিয়েছেন কঠোর অবস্থান।​দুর্যোগে ফ্রন্টলাইন ফাইটার: সিলেটের যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আকস্মিক বন্যায় এসি রুমের আরাম-আয়েশ ছেড়ে তাকে দেখা গেছে উপদ্রুত এলাকায়। নিজে উপস্থিত থেকে দুর্গম অঞ্চলে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ ও উদ্ধারকাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন।​পরিবেশ ও পর্যটনে আপসহীন: পরিবেশ ধ্বংসকারী অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধ, পাহাড় কাটা রোধ এবং নদী-প্রকৃতি রক্ষায় তার কঠোর আইনি পদক্ষেপ সর্বমহলে সাধুবাদ পেয়েছে।

​তিনি শুধু টেবিল-চেয়ারের কর্মকর্তা নন, তিনি মাঠের মানুষ। সিলেটের মানুষ দীর্ঘদিন পর একজন সত্যিকারের অভিভাবক পেয়েছে। আবেগাপ্লুত হয়ে মন্তব্য করেন স্থানীয় এক প্রবীণ নাগরিক।​প্রশাসনের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত
​গভীর রাতে ছিন্নমূল মানুষের মাঝে কম্বল নিয়ে হাজির হওয়া থেকে শুরু করে অসহায় মানুষের আইনি মুক্তি—মো. সারওয়ার আলম প্রমাণ করেছেন প্রশাসন চাইলে প্রকৃত অর্থেই ‘জনবান্ধব’ হতে পারে।

সিলেটবাসী মনে করছেন, কর্মীবান্ধব ও জনমুখী এই চৌকস কর্মকর্তার রেখে যাওয়া সুশাসন ও অনুকরণীয় নেতৃত্ব দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button