আইন-শৃঙ্খলাচট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে গণধর্ষণ ও হত্যা, আরও ২ আসামি গ্রেফতার

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর থানার আলোচিত গণধর্ষণ ও হত্যা মামলার তদন্তে নতুন অগ্রগতি অর্জন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে চলমান তদন্তে সম্প্রতি আরও দুই এজাহারভুক্ত আসামিকে গ্রেফতার করেছে সংস্থাটি। এর আগে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিখোঁজ এক নারীর পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর মামলাটি নতুন মাত্রা পায় এবং তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত উদঘাটিত হয়।মামলার নথি ও পিবিআই সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ জুলাই ২০২৪ ইং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ভিকটিম রিনা আক্তার তার পিতার বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হন। দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে তিনি ফটিকছড়ির একটি পাহাড়ি এলাকা অতিক্রম করার সময় এজাহারনামীয় ১ নম্বর আসামি আব্দুল মান্নান ও তার সহযোগীদের কবলে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, তাকে জোরপূর্বক মান্নানের টিলায় অবস্থিত একটি টিনশেড ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান।ভিকটিম বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কিন্তু কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তারা উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাতে থাকেন। এদিকে ঘটনার প্রায় ৯ দিন পর, ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম পাহাড়ি এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধের বিষয়টি এলাকাবাসীকে অবহিত করেন। খবর পেয়ে ভিকটিমের পরিবার এবং স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে অনুসন্ধান শুরু করেন।পরদিন ৫ আগস্ট দুপুরে মান্নানের টিলার পাশের একটি খাদ ও বাগান এলাকা থেকে এক নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের অবস্থা এতটাই বিকৃত ছিল যে তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পরে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের পর ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে উদ্ধার হওয়া মরদেহটি নিখোঁজ রিনা আক্তারের।
ঘটনার পর ভিকটিমের মা বাদী হয়ে আব্দুল মান্নানসহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে ভূজপুর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২৫)-এর ৯(৩)/৩০ ধারায় মামলা রুজু করা হয়। মামলাটি রুজুর পর এর গুরুত্ব বিবেচনায় আদালতের নির্দেশে ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে পিবিআই চট্টগ্রাম জেলা তদন্তভার গ্রহণ করে।
তদন্তের শুরু থেকেই পিবিআই ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। একাধিক তদন্তকারী কর্মকর্তা পর্যায়ক্রমে মামলাটি তদন্ত করেন। বিভিন্ন সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা, কল ডিটেইলস বিশ্লেষণ, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সম্ভাব্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়। তদন্ত চলাকালে এরই মধ্যে এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছিল।বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছেন পিবিআই চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ পরিদর্শক মো. সালাহ উদ্দিন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর মামলার বিভিন্ন দিক পুনঃমূল্যায়ন করেন এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের মাধ্যমে পলাতক আসামিদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চালান। তার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে গত ২০ জুন ২০২৬ দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টার দিকে ফেনী সদর থানা এলাকা থেকে এজাহারভুক্ত ৩৫ নম্বর আসামি মো. আলাউদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয়।গ্রেফতারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মামলার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন ২১ জুন ২০২৬ তারিখ দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানা এলাকা থেকে এজাহারভুক্ত ৩৪ নম্বর আসামি মো. রামজান আলীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে উভয় আসামিকে প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২২ জুন ২০২৬ তারিখে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করা হয়।
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনার দিন ভিকটিম রিনা আক্তারকে প্রথমে স্থানীয় নাজেম প্রকাশ নাদের নামের এক ব্যক্তি জোরপূর্বক আটক করে মান্নানের টিলার ঘরে নিয়ে যায়। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্য সহযোগীদের সেখানে ডেকে আনা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ভিকটিমকে সেখানে ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় এবং একপর্যায়ে তাকে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়।তদন্তে আরও জানা যায়, ঘটনার বিষয়ে ভিকটিম স্থানীয় লোকজনকে জানিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করলে আসামিদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। নিজেদের অপরাধ গোপন করতে তারা তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে পাহাড়ি খাদে ফেলে রাখা হয়। এরপর অভিযুক্তরা বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে চলে যায়।পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং জটিল হওয়ায় তদন্তে সময় লেগেছে। তবে ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত মামলাটির অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, এখনও একাধিক আসামি পলাতক রয়েছে। তাদের অবস্থান শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য কোনো ব্যক্তি রয়েছে কি না, সে বিষয়েও অনুসন্ধান চলছে। তদন্তের স্বার্থে অনেক তথ্য এই মুহূর্তে প্রকাশ করা সম্ভব না হলেও মামলার প্রতিটি দিক গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।পিবিআই চট্টগ্রাম জানিয়েছে, মামলাটির তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে। জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে কাজ করছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে আদালতে গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নতুন করে দুই আসামি গ্রেফতার হওয়ায় মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা আশা করছেন, চলমান তদন্তের মাধ্যমে পলাতক আসামিদেরও দ্রুত গ্রেফতার করা সম্ভব হবে এবং ভিকটিম পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যাবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button