আইন-শৃঙ্খলা

অটোরিকশার লোভে চালককে হত্যা, ১২ ঘণ্টার মধ্যে মূল অভিযুক্তসহ গ্রেফতার ৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: জামালপুরে অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে এক চালককে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ঘটনার মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই মূল অভিযুক্তসহ মোট ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত এবং চোরাইকৃত অটোরিকশার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উদ্ধার করা হয়েছে।

পিবিআই সূত্রে জানা যায়, নিহত অটোরিকশা চালক নায়েব আলী গত ২১ জুন ২০২৬ তারিখ ভোর ৪টার দিকে প্রতিদিনের মতো কমিউটার ট্রেনের যাত্রী পরিবহনের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। তবে অন্যান্য দিনের মতো তিনি আর বাড়িতে ফিরে আসেননি। পরে তাঁর ছেলে মোঃ মামুন ওরফে মমিন মেলান্দহ থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন এবং বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার করা হয়।

ফেসবুকে প্রচারিত নিখোঁজ সংক্রান্ত পোস্ট দেখে এক ব্যক্তি নিহতের স্বজনদের জানান যে, ইসলামপুর থানাধীন চরপুটিমারী ইউনিয়নের বেনুয়ারচর বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের একটি নির্জন ধানক্ষেতে লাগেজের ভেতর অজ্ঞাত এক পুরুষের মরদেহ পাওয়া গেছে। খবর পেয়ে নিহতের স্বজনরা ইসলামপুর থানায় গিয়ে মরদেহটি নায়েব আলীর বলে শনাক্ত করেন।

এ ঘটনায় নিহতের ছেলে মোঃ মামুন ওরফে মমিন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে ইসলামপুর থানায় হত্যা, প্রমাণ লোপাট ও চুরির অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। পরে পিবিআই সদর দপ্তরের নির্দেশনায় মামলাটি পিবিআই জামালপুর জেলা ইউনিট তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করে। মামলার তদন্তভার অর্পণ করা হয় এসআই (নিঃ) ফয়জুর রহমানের ওপর।

পিবিআই প্রধান মোঃ মোস্তফা কামাল, অতিরিক্ত আইজিপির তত্ত্বাবধান এবং পিবিআই জামালপুরের ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত, পিপিএম-এর সার্বিক নির্দেশনায় তদন্তকারীরা ঘটনার পর থেকেই ছায়াতদন্ত শুরু করেন। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত চালিয়ে ২৪ জুন রাত সাড়ে ৩টার দিকে মেলান্দহ থানার চাকদহ সর্দারবাড়ি এলাকা থেকে মূল অভিযুক্ত মোঃ নাহিদুল ইসলাম (৩০)কে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারের পর নাহিদুল ইসলামের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে চোরাইকৃত অটোরিকশার যন্ত্রাংশ ক্রয়কারী মোঃ সোলাইমান কবির (৫০), মোঃ শফিকুল ইসলাম (৪১), মোঃ আব্দুল কাদের (৫৬), মোঃ রাসেল হোসেন (৩৪) এবং চোরাই মালামাল পরিবহনে সহায়তাকারী সাগর পাশা (২৬)কে গ্রেফতার করা হয়।

তদন্তে বেরিয়ে আসে, মাত্র ১০ হাজার টাকার জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য নাহিদুল ইসলাম অটোরিকশা চুরির পরিকল্পনা করে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগীদের নিয়ে তিনি নায়েব আলীকে হত্যা করেন এবং অটোরিকশাটি নিয়ে যান। পরে অটোরিকশাটি বিভিন্ন অংশে কেটে বিক্রি করার চেষ্টা করা হয়।

পিবিআইয়ের অভিযানে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত জিআই তার উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি চোরাইকৃত মিসুক অটোরিকশার চারটি ব্যাটারি, একটি কন্ট্রোলার, তিনটি চাকা, মোটর ডিফারেনশিয়াল, দুটি সকেট বাম্পার, সামনের গ্লাস এবং লোহার বডির বিভিন্ন কাটা অংশ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত সব আলামত আইনানুগ প্রক্রিয়ায় জব্দ করা হয়েছে।

পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা জেনেশুনে চোরাই মালামাল কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে মূল অভিযুক্ত নাহিদুল ইসলামকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। মামলার তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য কোনো ব্যক্তি আছে কিনা, সে বিষয়েও অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

পিবিআই কর্মকর্তারা জানান, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত তদন্ত এবং সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সকলকে আইনের আওতায় আনতে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button