ইসলাম ধর্ম

অদম্য ঈমানি শক্তির মূর্ত প্রতীক হজরত সা’দ (রা.)

ধর্ম ডেস্ক: ইসলামী ইতিহাসের পাতায় ঈমানি দৃঢ়তা ও বীরত্বের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম হজরত সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রা.)। তাঁর জীবন যেমন ছিল ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর, তেমনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে তাঁর গভীর আত্মিক ও পারিবারিক সম্পর্ক আজও মুমিনদের হৃদয়ে প্রেরণা জোগায়।

সা’দ (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ তাঁর মায়ের কাছে ছিল অসহনীয়। ছেলেকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে আনতে মা এক অভিনব ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল’-এর পথ বেছে নেন। তিনি ঘোষণা দেন, ছেলে যতক্ষণ ইসলাম ত্যাগ না করবে, ততক্ষণ তিনি অন্ন-জল স্পর্শ করবেন না। টানা তিন দিন অনশনে মায়ের অবস্থা যখন সংকটাপন্ন, তখন প্রিয় নবীর (সা.) ওপর নাজিল হয় সূরা আনকাবূতের ৮ নম্বর আয়াত: “আর আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করতে। তবে তারা যদি তোমার ওপর প্রচেষ্টা চালায় আমার সাথে এমন কিছুকে শরীক করতে যার সম্পর্কে তোমার জ্ঞান নেই, তবে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না…”

এই আয়াত সা’দ (রা.)-এর দ্বিধা দূর করে দেয়। তিনি মায়ের সামনে গিয়ে অটল কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “মা, আপনার দেহে যদি একশোটি প্রাণও থাকে আর সেগুলো যদি একে একে বের হতে থাকে, তবুও আমি ইসলাম ছাড়ব না।” ছেলের এমন পাহাড়সম সংকল্প দেখে অবশেষে মায়ের জেদ ভেঙে যায় এবং পরবর্তীতে তিনিও ইসলাম গ্রহণ করেন (তিরমিজি: ৩১৮৯)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে নিয়ে অত্যন্ত গর্ববোধ করতেন। তিনি প্রকাশ্যে বলতেন, “ইনি আমার মামা; পারলে কেউ তাঁর মতো মামা দেখাক!” (মাতা ওহীব বিনতে আবদে মানাফের সূত্রে কুরাইশ বংশীয় আত্মীয়তা)। নবীজি (সা.) তাঁর জন্য বিশেষ দোয়া করেছিলেন— “হে আল্লাহ, সা’দ যখনই আপনার কাছে কিছু চায়, আপনি কবুল করুন।” ইতিহাসের তথ্যমতে, সা’দ (রা.)-এর দোয়া কখনও বিফলে যেত না; তাঁর দোয়া বা বদদোয়া অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হতো।

উহুদের যুদ্ধে এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। সা’দ (রা.)-এর আপন ভাই উতবা ইবনু আবী ওয়াক্কাস রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে, যাতে নবীজির দাঁত ভেঙে রক্ত ঝরতে থাকে। আদর্শের প্রশ্নে সা’দ (রা.) এতটাই আপসহীন ছিলেন যে, তিনি বলেছিলেন, “আল্লাহর কসম! আমার জীবনে কোনো মানুষকে হত্যা করার তীব্র বাসনা জাগেনি, যতটা এই ভাইকে হত্যার জন্য জেগেছিল।”

রণাঙ্গনে সা’দ (রা.)-এর দক্ষতা দেখে রাসূল (সা.) বলেছিলেন, “তির ছোড়ো সা’দ! আমার মা-বাবা তোমার জন্য উৎসর্গ হোক।” ইতিহাসে সা’দ (রা.)-ই একমাত্র ব্যক্তি যাঁর জন্য রাসূল (সা.) তাঁর পিতা-মাতাকে উৎসর্গ করার মতো বিরল ও সম্মানজনক বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন (বুখারি: ৪০৫৫)।

জীবনের শেষ দিকে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হলেও জীবন যাপনে ছিলেন অতি সাধারণ। তিনি নিজের অর্জিত সম্পদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ অসিয়ত করার অনুমতি পেয়েছিলেন, যাতে উত্তরাধিকারীরা কারও মুখাপেক্ষী না হয়। মৃত্যুর প্রাক্কালে তিনি তাঁর সেই পুরনো জামাটি নিয়ে আসতে বলেন, যা পরিধান করে তিনি বদর যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর অন্তিম ইচ্ছা ছিল, ঐ ঐতিহাসিক জামাটিকেই যেন তাঁর কাফন হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যাতে সেই বীরত্বের চিহ্ন নিয়ে তিনি রবের সামনে দাঁড়াতে পারেন।

জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবির (আশারায়ে মুবাশশারা) অন্যতম এই মহান বীর হিজরি ৫৫ সনের দিকে ইন্তেকাল করেন। মুহাজির ও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বশেষ প্রয়াত সাহাবি। ইসলামের ইতিহাসের এই অকুতোভয় সেনানী আজও অনাগত প্রজন্মের জন্য ঈমান ও সাহসিকতার আদর্শ হয়ে আছেন।


তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, জামে আত-তিরমিজি ও আল-মুস্তাদরাক।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button