ক্ষমার গুণেই টিকে থাকে সংসার: সুখী দাম্পত্যে ইসলামি জীবনদর্শনের গুরুত্ব
ধর্ম ও জীবন ডেস্ক: দাম্পত্য জীবন মানে দুটি নির্ভুল মানুষের মিলন নয়; বরং এটি হলো দুটি অপূর্ণ মানুষের এক হয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে হাঁটার একটি পবিত্র অঙ্গীকার। দীর্ঘ এই পথচলায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ, রাগ-অভিমান বা ভুল হওয়া নিতান্তই মানবিক বিষয়। তবে এই ভুলগুলোকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা বা ভেঙে ফেলা নির্ভর করে মূলত ক্ষমার মানসিকতার ওপর। ইসলামি জীবনদর্শনে প্রতিশোধ বা অহংকারের পরিবর্তে ক্ষমা ও সহনশীলতাকেই দাম্পত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের ক্ষমার শিক্ষা দিয়ে বলেছেন, “তারা যেন ক্ষমা করে এবং উদারতা প্রদর্শন করে। তোমরা কি ভালোবাসো না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন? আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু” (সূরা আন-নূর: ২২)। অর্থাৎ, বান্দা যদি নিজের জন্য রবের ক্ষমা প্রত্যাশা করে, তবে তাকেও তার জীবনসঙ্গীর ভুলগুলো ক্ষমা করার উদারতা দেখাতে হবে।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে সহমর্মিতা। সূরা আন-নিসার ১৯ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। যদি তাদের কোনো বিষয় তোমাদের অপছন্দ হয়, তবে হতে পারে তোমরা এমন একটি বিষয় অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।” এই আয়াত আমাদের শেখায় যে, একটি মাত্র ভুল বা ত্রুটির কারণে জীবনসঙ্গীকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, “আদম সন্তানের প্রত্যেকেই ভুলকারী; আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা বেশি বেশি তওবা বা অনুতাপ করে” (তিরমিযী: ২৪৯৯)। মহান আল্লাহ যদি অনুতপ্ত বান্দাকে গ্রহণ করতে পারেন, তবে দাম্পত্য জীবনে একে অপরের প্রতি কঠোর হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। মনে রাখা প্রয়োজন, পরিবারের সাথে উত্তম আচরণকারী ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম মানুষ হিসেবে গণ্য।
অনেকে মনে করেন ক্ষমা করলে ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয় বা মর্যাদা কমে যায়। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা হলো— “কোনো বান্দা ক্ষমা করলে আল্লাহ তার মর্যাদা ছাড়া আর কিছুই বাড়িয়ে দেন না” (সহীহ মুসলিম: ২৫৮৮)। অর্থাৎ, ক্ষমা দুর্বলতা নয় বরং এটি উচ্চতর নৈতিক চরিত্র ও সুদৃঢ় ঈমানের পরিচয়।
ক্ষমা তখনই সার্থক হয় যখন ভুলকারী নিজের ত্রুটি স্বীকার করে এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করে। তবে একই ভুলকে অভ্যাসে পরিণত করা বা সম্পর্কের মধ্যে নিয়মিত নির্যাতন ও জুলুম করা ইসলাম সমর্থন করে না। নির্যাতনের ক্ষেত্রে অবশ্যই শরীয়তসম্মত উপায়ে আইনি বা পারিবারিক সমাধান খুঁজতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যে সংসারে ক্ষমার চর্চা থাকে সেখানে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসা দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়। সন্তানদের জন্য একটি শান্তিময় ও সুস্থ পরিবেশ তৈরি হয় এবং শয়তানের প্ররোচনায় সংসার ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। সর্বপোরি, ক্ষমা ও বিনয়ের মাধ্যমে মহান আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভ করা সহজ হয়।
একটি সুন্দর সম্পর্কের জন্য ভুলকে নয়, বরং মানুষটিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। জীবনসঙ্গীর হাজারো ত্যাগ ও দায়িত্ববোধকে একটি ছোট ভুলের কারণে মুছে ফেলা ন্যায়সঙ্গত নয়। যেখানে ক্ষমা ও উদারতা থাকে, সেখানে সম্পর্ক পুনর্জীবিত হয়। পক্ষান্তরে যেখানে অহংকার জয়ী হয়, সেখানে ভালোবাসার প্রদীপ ধীরে ধীরে নিভে যায়। তাই একটি সুখী ও স্থায়ী দাম্পত্যের জন্য ক্ষমা কেবল একটি আবেগ নয়, এটি একটি মহৎ ইবাদত।



