ইসলামিক শরীয়াহ এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবায়ে কেরামের অনুসৃত বিশুদ্ধ আকিদা ও উসুল (নীতিমালা) অনুযায়ী হাদীস যাচাই-বাছাই করা দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।উলূমুল হাদীস (হাদীস শাস্ত্র)-এর আলোকে সহিহ হাদীস ও জাল হাদীস চেনার প্রধান মাধ্যমসমূহ নিচে উল্লেখ করা হলো:

🔴১. সংবাদ ও হাদীস যাচাইয়ের বিষয়ে কুরআনের নির্দেশ
ইসলামী শরীয়াহতে যাচাই ছাড়া কোনো কথা গ্রহণ করা নিষেধ।
সংবাদ যাচাইয়ের নির্দেশ:
হে মুমিনগণ! কোনো ফাসেক (অসংযত/পাপাচারী ব্যক্তি) যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা ভালোভাবে যাচাই করে নাও।
সূরা আল-হুজুরাত (৪৯:৬)
না জেনে কোনো কিছু অনুসরণের নিষেধাজ্ঞা:
যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পোড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এদের প্রতিটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
সূরা আল-ইসরা (১৭:৩৬)
🔴২. জাল হাদীস বর্ণনার ভয়াবহতা (সহিহ হাদীসের আলোকে)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নামে মিথ্যা বা জাল কথা বানিয়ে প্রচার করার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।
বানাওয়াট হাদীস প্রচারের পরিণতি:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করবে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।
(সহিহ বুখারী: ১১০; সহিহ মুসলিম: ৪)
যাচাই ছাড়া হাদীস ছড়ানো:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: কোনো মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই করা ছাড়া) তা-ই বর্ণনা করে।
সহিহ মুসলিম (ভূমিকা/মুকাদ্দিমা, হাদীস: ৫)
🔴৩. সহিহ হাদীস চেনার শর্তাবলী:
হাদীস বিশারদ (মুহাদ্দিসীন)গণ মূল উৎস থেকে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পর্যন্ত হাদীসের সনদ (বর্ণনাধারা) ও মতন (মূল বক্তব্য) বিশ্লেষণের জন্য ৫টি মূল শর্ত নির্ধারণ করেছেন।
এগুলো পূরণ হলেই হাদীসটিকে সহিহ’ বলা হয়:
ইত্তিসালুস সনদ (সনদের ধারাবাহিকতা):
হাদীসের বর্ণনাকারী সারি (chain of narrators)-র একজন থেকে আরেকজনের সাক্ষাৎ ও হাদীস গ্রহণের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ থাকতে হবে।
আদালাত (ন্যায়পরায়ণতা):
প্রত্যেক বর্ণনাকারীকে মুত্তাকী, সৎ ও মিথ্যা বর্জনকারী (আদেল) হতে হবে।
দাবত (স্মৃতিশক্তি/সংরক্ষণ দক্ষতা):
বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ও নিখুঁত হতে হবে, অথবা লিখিত রূপ সঠিকভাবে সংরক্ষণকারী হতে হবে।
শায না হওয়া:
হাদীসটি অধিকতর নির্ভরযোগ্য কোনো বর্ণনাকারীর হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না।
ইল্লাত বা সূক্ষ্ম ত্রুটিমুক্ত হওয়া:
হাদীসের ভেতরে কোনো সূক্ষ্ম লুকায়িত ত্রুটি থাকা যাবে না যা সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না।
🔴৪. জাল (মওজু) হাদীস চেনার আলামত ও উপায়:
সাহাবী ও তাবেঈদের যুগে হাদীসের সনদ যাচাই করার যে ধারা চালু হয়, তার ওপর ভিত্তি করে মুহাদ্দিসগণ জাল হাদীস চিহ্নিত করার কিছু লক্ষণ নির্ধারণ করেছেন:
(ক) সনদের ত্রুটি (রাবীর অবস্থা)
বর্ণনাকারীর ইতিহাস:
সনদের কোনো রাবী যদি ইতিহাসে মিথ্যাবাদী বা হাদীস জালকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকেন।
ঐতিহাসিক অসঙ্গতি:
বর্ণনাকারী এমন ব্যক্তির নিকট থেকে হাদীস শোনার দাবি করেন, যিনি তার জন্মের আগেই মারা গেছেন বা তাঁদের মধ্যে কখনো সাক্ষাৎ সম্ভব ছিল না।
স্বীকারোক্তি:
অনেক সময় জালিয়াত নিজেই স্বীকার করে যে সে অমুক হাদীস বানিয়েছে (যেমন কিছু কিচ্ছা-কাহিনীকারক বা বিদআতী দল)।
(খ) মতনের ত্রুটি (মূল বক্তব্যের অবস্থা)
কুরআনের সাথে স্পষ্ট বিরোধ: হাদীসটির বক্তব্য যদি কুরআনের কোনো সুস্পষ্ট ও অকাট্য আয়াতের সরাসরি বিরোধী হয় এবং কোনোভাবেই সমন্বয় করা না যায়।
সহিহ ও মুতাওয়াতির হাদীসের বিরোধী: যে বক্তব্য বুখারী ও মুসলিম সহ গ্রহণযোগ্য মুতাওয়াতির হাদীসের মূলনীতির বিপরীত।
সামান্য আমলে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সওয়াব বা শাস্তি:
কোনো ছোট বা সামান্য কাজের জন্য অস্বাভাবিক বড় পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি বা ছোট ভুলের জন্য চরম ভয়াবহ শাস্তির উল্লেখ থাকা (যা সাধারণ কিচ্ছা-কাহিনীদের বৈশিষ্ট্য)
ভাষা ও ভাবধারার নিম্নমান:
নবুওয়াতের যে প্রজ্ঞা, গাম্ভীর্য ও:
ভাষার সাবলীলতা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণীতে থাকে, সেটার সাথে না মেলা বা অসংলগ্ন কথা হওয়া।
বাস্তবতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক নীতির বিপরীত: যা দৃশ্যমান ঐতিহাসিক সত্য বা সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির সাথে একেবারেই অসঙ্গতিপূর্ণ।
🔴৫. সালাফ ও সাহাবাগণের আকিদা ও অবস্থান:
সাহাবাগণ হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর ও সতর্ক ছিলেন।
তাবেঈ ইমাম ইবনে সিরীন (রহ.) বলেছেন:
সূচনাকালে লোকেরা সনদের কথা জিজ্ঞেস করত না।
কিন্তু যখন ফিতনা ছড়িয়ে পড়ল, তখন তারা বলল:
তোমাদের বর্ণনাকারীদের নাম বলো।’ অতঃপর যদি সুন্নাতের অনুসারীদের দেখা হতো, তবে তাদের হাদীস গ্রহণ করা হতো; আর যদি বিদআতীদের দেখা হতো, তবে তাদের হাদীস গ্রহণ করা হতো না।
সহিহ মুসলিম (ভূমিকা)
আমাদের করণীয়:
⭕১. আমল বা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে হাদীস শেয়ার বা অনুসরণ :
করার আগে তা কোনো মুহাদ্দিস বা নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থ (যেমন: সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম, জামে আত-তিরমিজী, সুনানে আবু দাউদ ইত্যাদি) দ্বারা প্রমাণিত কি না তা নিশ্চিত হওয়া।
⭕২. বর্তমানে নির্ভরযোগ্য হাদীস সফটওয়্যার, তথ্যপঞ্জি বা প্রখ্যাত মুহাদ্দিসদের যেমন:
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী, ইমাম আলবানী প্রমুখের তাহকীক (গবেষণা) দেখে হাদীসের মান (সহিহ, হাসান, দুর্বল বা জাল) জেনে নেয়া।
ইমাম ইবনে সিরীন (রহ.)-এর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বাণীটির সহজ অর্থ, পটভূমি এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবায়ে কেরামের মানহাজ/আকিদা অনুযায়ী এর তাফসীর ও ব্যাখ্যা।
ইমাম ইবনে সিরীন (রহ.)-এর এই ঐতিহাসিক উক্তিটি ‘সহিহ মুসলিম’-এর ভূমিকার (المقدمة) মধ্যে সনদের গুরুত্ব অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।
«لَمْ يَكُونُوا يَسْأَلُونَ عَنِ الإِسْنَادِ، فَلَمَّا وَقَعَتِ الْفِتْنَةُ قَالُوا: سَمُّوا لَنَا رِجَالَكُمْ، فَيُنْظَرُ إِلَى أَهْلِ السُّنَّةِ فَيُؤْخَذُ حَدِيثُهُمْ، وَيُنْظَرُ إِلَى أَهْلِ الْبِدَعِ فَلاَ يُؤْخَذُ حَدِيثُهُمْ»
সূচনাকালে (সাহাবাগণের প্রাথমিক যুগে) সাহাবী ও তাবেঈগণ হাদীসের ‘সনদ’ (কার কাছ থেকে হাদীসটি শুনেছেন তার নাম ও পরিচয়) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন না।
কিন্তু যখন ফিতনা (গৃহযুদ্ধ ও বিদআতী দলগুলোর আত্মপ্রকাশ) ছড়িয়ে পড়ল, তখন মুহাদ্দিসগণ বললেন:
তোমাদের বর্ণনাকারীদের (সূত্রের) নাম বলো।’ অতঃপর যাদের মধ্যে সুন্নাতের অনুসারী (আহলুস সুন্নাহ) দেখা যেত, কেবল তাদের হাদীস গ্রহণ করা হতো; আর যারা বিদআতী (আহলুল বিদআহ) ছিল, তাদের হাদীস গ্রহণ করা হতো না।
সহিহ মুসলিম (ভূমিকা/মুকাদ্দিমা, পরিচ্ছেদ: সনদের প্রামাণিকতা ও বর্ণনাকারীদের যাচাই)
⭕২. সহজ ভাষায় হাদীস/বাণীটির মূল অর্থ:
সহজ কথায়, ইমাম ইবনে সিরীন (রহ.) উম্মতকে হাদীস যাচাই-বাছাইয়ের ইতিহাসের একটি টার্নিং পয়েন্ট বোঝাচ্ছেন:
⭕১. প্রথম যুগ (ফিতনাহীন সময়):
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে এবং খলিফাদের শুরুর দিকে সব সাহাবীই ছিলেন সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত (আদেল)। তাই কোনো সাহাবী যখন বললেন, আল্লাহর রাসূল বলেছেন। তখন কেউ জিজ্ঞেস করতেন না তুমি কার কাছ থেকে শুনেছ?
কারণ সব সাহাবীই সত্যবাদী ছিলেন।
⭕২. দ্বিতীয় যুগ (ফিতনার সময়):
পরবর্তীতে যখন খারিজি, শিয়া/রাফেজি, কাদরিয়াসহ নানা বিভ্রান্ত ও রাজনৈতিক দল সৃষ্টি হলো, তখন কিছু লোক নিজেদের মতামত ও আকিদাকে সঠিক প্রমাণ করতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নামে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা কথা ছড়াতে লাগল।
⭕৩. প্রতিরোধ ব্যবস্থা (সনদ যাচাই):
তখন তাবেঈগণ ও মুহাদ্দিসগণ একটি নিয়ম চালু করলেন তুমি কোনো কথা বললেই বিশ্বাস করব না, আগে বলো কার কার মাধ্যমে এই হাদীস তোমার কাছে পৌঁছেছে।
বর্ণনাকারীদের নাম জানার পর তাদের আকিদা, চরিত্র ও স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করে তবেই হাদীস গ্রহণ করা হতো।
⭕৩. কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে এর ব্যাখ্যা:
(ক) দ্বীনের সুরক্ষায় সনদ হলো ইসলামের অনন্য বৈশিষ্ট্য
ইমাম আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেছেন:
সনদ হলো দ্বীনের অংশ। সনদ না থাকলে যার যা ইচ্ছা তা-ই বলত।”ষ
সহিহ মুসলিম (ভূমিকা)
(খ) কুরআনের নির্দেশনার প্রতিফলন:
আল্লাহ তাআলা কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন দ্বীনের যেকোনো কথা যাচাই করার জন্য:
হে মুমিনগণ! কোনো ফাসেক যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই-বাছাই করে নাও।
সূরা আল-হুজুরাত (৪৯:৬)
বিদআতী ও মিথ্যাবাদীরা দ্বীনের ব্যাপারে ‘ফাসেক’-এর অন্তর্ভুক্ত। তাই তাদের বর্ণিত হাদীস প্রত্যাখ্যান করা এই আয়াতেরই প্রয়োগ।
(গ) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সতর্কবাণী
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে শেষ জামানায় কিছু লোক ভিত্তিহীন কথা ছড়াবে:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
শেষ জামানায় এমন কিছু মিথ্যুক ও প্রতারকের আগমন ঘটবে, যারা তোমাদের কাছে এমন সব হাদীস আনবে যা তোমরা শোনোনি এবং তোমাদের পিতৃপুরুষরাও শোনেনি।
সুতরাং তোমরা তাদের থেকে সতর্ক থেকো, যেন তারা তোমাদের বিভ্রান্ত না করতে পারে এবং ফিতনায় না ফেলতে পারে।
সহিহ মুসলিম (ভূমিকা, হাদীস: ৭)
⭕৪. রাসুল ও সাহাবাদের আকিদা অনুযায়ী এই বাণী থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
আকিদার মানদণ্ড হিসেবে বর্ণনাকারী নির্বাচন:
কোনো ব্যক্তি নিজেকে সুন্নাতের অনুসারী (আহলুস সুন্নাহ) দাবি করলেই হবে না; তার আকিদা সুন্নাহভিত্তিক কি না তা দেখতে হবে।
বিদআতী (যেমন: খারিজি, মু’তাজিলা, ক্বাদারিয়া বা মনগড়া আকিদার অধিকারী) ব্যক্তির বর্ণিত কথা গ্রহণ করা থেকে সালাফগণ সতর্ক করতেন।
অন্ধ বিশ্বাস বর্জন:
দ্বীনের নামে কেউ কোনো কথা বা হাদীস বললেই তা বিশ্বাস বা আমল করা যাবে না।
হাদীসটির সুনির্দিষ্ট উৎস (সনদ ও রেফারেন্স) আছে কি না এবং মুহাদ্দিসগণের মতে তা গ্রহণযোগ্য (সহিহ/হাসান) কি না তা দেখা আবশ্যক।
সনদ ব্যবস্থা সুরক্ষার আমানত:
ইসলামই পৃথিবীর একমাত্র ধর্ম যা তার মূল প্রবক্তার কথাগুলোকে বর্ণনাকারীদের নির্ভুল শৃঙ্খলা বা সনদের মাধ্যমে হুবহু সংরক্ষণ করেছে।
ইসলামিক শরীয়াহ এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবায়ে কেরামের অনুসৃত বিশুদ্ধ আকিদা ও উসুল (নীতিমালা) অনুযায়ী হাদীস যাচাই-বাছাই করা দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।



