সাতক্ষীরায় মাদক জব্দ-ধ্বংস মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে

হাবিবুল্লাহ বাহার হাবিব: মাদকের জোয়ারে ভাসছে সাতক্ষীরা জেলা। সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরা যেন ক্রমেই মাদক চোরাচালানের অন্যতম প্রবেশপথে পরিণত হচ্ছে। প্রতিবছর সীমান্তে কোটি কোটি টাকার মাদক উদ্ধার ও ধ্বংস করা হলেও থামছে না মাদকের প্রবাহ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ হলেও, এসব চোরাচালানের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। চোরাকারবারী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে সীমান্তজুড়ে মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক ভাঙা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন, প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার মাদক উদ্ধার হলেও সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বাহক ও খুচরা কারবারিরা ধরা পড়লেও, এই চোরাচালান চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা গেলে মাদক নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে অভিমত সচেতন মহলের।
মাদক পাচারকারীরা সাতক্ষীরা সীমান্ত কে রুট হিসেবে ব্যবহার করে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাদক প্রবেশের পাশাপাশি অন্যান্য জেলায় বিক্রি করে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ সমাজ।

মাদকের কালো ছায়া তরুণদের স্বপ্নকে গ্রাস করে নিচ্ছে। নিভিয়ে দিচ্ছে সম্ভাবনার আলো। দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই হলো তরুণ। তারাই দেশের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, উন্নয়নের চালিকাশক্তি ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সম্ভাবনাময় মুখ। তবে উদ্বেগজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, সমাজের একাংশ তরুণ আজ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ফলে তাদের শিক্ষা, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মাদকের ভয়াবহ বিস্তারে যুবসমাজের একটি অংশ বিপথগামী হচ্ছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এতে অনেক পরিবার সন্তানের কারণে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।
এরই মধ্যে সীমান্তে উদ্ধার হওয়া প্রায় ৭৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ধ্বংস করেছে সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়ন (৩৩ বিজিবি)।
রোববার ২৮ শে জুন সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে আয়োজিত মাদকদ্রব্য ধ্বংসকরণ অনুষ্ঠান-২০২৬ -এ আনুষ্ঠানিকভাবে এসব মাদক ধ্বংস করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিজিবির দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী আশিকুর রহমান, ওএসপি, পিএসসি। বক্তব্য দেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউছার আজিজ, খুলনা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. মাসুদুর রহমান, পিএসসি, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদি হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নুরুল্লাহ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান শরীফসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।
বিজিবি সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সাতক্ষীরা সদর ও কলারোয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন বিওপি এলাকায় পরিচালিত অভিযানে ৪৮ জনকে আটক করা হয়।
এ সময় প্রায় ১২৬ কোটি ৬৬ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫৬ টাকা মূল্যের বিভিন্ন চোরাচালানি পণ্য জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ৭৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য এদিন ধ্বংস করা হয়েছে। ধ্বংস করা মাদকের মধ্যে ছিল ৩ হাজার ৭৯১ বোতল বিভিন্ন ধরনের মদ, ৪ হাজার ৫২৪ বোতল ফেনসিডিল, ৪৭ হাজার ২৭০ পিস ইয়াবা, ৬ লাখ ৭ হাজার ৭৬৯ পিস বিড়ি ও সিগারেট, ৩৩ দশমিক ৪০০ কেজি গাঁজা, ৬৩ লাখ ১৩ হাজার ১২০ পিস অবৈধ ঔষধ, ৩৫ কেজি তামাকের গুঁড়া, ২ বোতল লিকুইড সীসা, ১০০ কেজি মাদক তৈরির কাঁচামাল, ৭২ দশমিক ৫০ মিলিলিটার এলএসডি, ৮ দশমিক ৫৮৩ কেজি ক্রিস্টাল মেথ (আইস) এবং আফিম তৈরির ২০ বোতল কেমিক্যাল।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান বলেন, মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বিজিবি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ জোরদারের লক্ষ্যে উদ্ধার করা মাদকদ্রব্য নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে ধ্বংস করা হচ্ছে।



