সমবায় অধিদপ্তরের আলাদিনের চেরাগ সহকারী পরিদর্শক ইলিয়াস সিকদার

সরকার পরিবর্তনের পর কেরানীগঞ্জে ১০ কোটির সাম্রাজ্য ও বিলাসী জীবন | বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে দিয়ে জুতার ফিতা বাঁধানোর ছবি প্রোফাইলে রেখে আচরণবিধি লঙ্ঘন | নারী সহকর্মীদের শ্লীলতাহানি ও সাংবাদিকদের হুমকির অভিযোগে তোলপাড়
বিশেষ প্রতিবেদক, অপরাধ বিচিত্রা: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমবায় অধিদপ্তরের এক সাধারণ সরকারি কর্মচারী মো. ইলিয়াস সিকদারের বিরুদ্ধে উঠেছে ক্ষমতার অপব্যবহার, সীমাহীন দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং চরম নৈতিক স্খলনের পর্বতসম অভিযোগ। নীলফামারীর জলঢাকা থেকে মানিকগঞ্জের শিবালয় এবং পরবর্তীতে ঢাকা জেলা সমবায় কার্যালয়ে ডেক্স বাগিয়ে নেওয়া এই কর্মকর্তার খুঁটির জোর কোথায়?-তা নিয়ে সমবায় ভবনের আনাচে-কানাচে কানাকানি ও গুঞ্জন এখন তুঙ্গে। সামান্য একজন ‘সহকারী পরিদর্শক পদের কর্মচারী হয়েও আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন তিনি। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় পট পরিবর্তনের পর তার অবৈধ সম্পদের পাহাড় জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মো. ইলিয়াস সিকদার ঢাকা সংলগ্ন কেরানীগঞ্জ এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় ও সমবায় সূত্রের দাবি, কেরানীগঞ্জের ওই জমিতে বিলাসবহুল অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্পত্তি ক্রয়ে তিনি প্রায় ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। একজন সাধারণ গ্রেডের সহকারী পরিদর্শকের বৈধ আয় দিয়ে এত অল্প সময়ে কোটি কোটি টাকার জমি কেনা এবং রাজকীয় জীবনযাপন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সমবায় সমিতির লাইসেন্স প্রদান, অডিট ও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার ঘুষ-বাণিজ্য এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই এই বিপুল পরিমাণ কালো টাকা কামিয়েছেন তিনি।

সরকারি কর্মচারী আচরণবিধির তোয়াক্কা না করে মো. ইলিয়াস্ সিকদার নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল নং-০১৯৩০৯২১৫২১ এর হোয়াটসঅ্যাপ (WhatsApp) অ্যাকাউন্টের প্রোফাইল পিকচারে (DP) অত্যন্ত আপত্তিকর ও বিতর্কিত ছবি ব্যবহার করে চরম ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। (যার প্রমাণ সম্বলিত স্ক্রিনশট অপরাধ বিচিত্রার হাতে এসেছে)। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তিনি একটি রাজকীয় চেয়ারে বসে আছেন এবং ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নতজানু হয়ে তার বুট জুতোর ফিতা বেঁধে দিচ্ছেন! একজন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে সংবেদনশীল ও বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের ছবি এভাবে বিকৃত (এডিট) করে নিজের অহংকার ও ক্ষমতার দাপট প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করা “সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই নিয়ে প্রশাসনের উচ্চমহলেও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ইলিয়াস সিকদারের বিরুদ্ধে শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়, মারাত্মক নৈতিক স্খলনেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে। অফিসে নিজের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন সময়ে নারী সহকর্মীদের সাথে চরম অসৌজন্যমূলক, অশ্লীল ও অনৈতিক আচরণ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী নারী সহকর্মীরা লোকলজ্জা ও চাকরির ক্ষতির ভয়ে এতদিন মুখ না খুললেও, এখন তার এই বিকৃত মানসিকতার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছেন। নারী সহকর্মীদের কুপ্রস্তাব দেওয়া এবং তাতে রাজি না হলে কর্মক্ষেত্রে হেনস্তা করা তার নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলে ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে।
তার এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং উল্টো সাংবাদিকদের বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি ও দেখে নেওয়ার অ দেখান। এই ঘটনায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ও সরকারি তথ্য প্রাপ্তিতে বাধার সৃষ্টি করায় ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) দায়ের করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইলিয়াস সিকদারের এই দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। অতীতেও বিভিন্ন কর্মস্থলে অনিয়মের কারণে তাকে একাধিক বিভাগীয় মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছিল এবং তার পদোন্নতি দীর্ঘদিন আটকে ছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে বারবার তিনি পার পেয়ে যান এবং ঢাকা জেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডেপুটেশনে পদায়ন বাগিয়ে নেন। (উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ২১ ডিসেম্বরের সমবায় অধিদপ্তরের এক আদেশে তাকে নীলফামারীর জলঢাকা থেকে মানিকগঞ্জের শিবালয়ে বদলি করা হয়েছিল, কিন্তু তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ও উপজেলা চেয়ারম্যান শাহিনের তদবিরের জোরে তিনি ঢাকার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান নিশ্চিত করেন)।
একজন সাধারণ সহকারী পরিদর্শকের এই বিপুল অবৈধ সম্পদ, নারী কেলেঙ্কারি এবং ডিজিটাল মাধ্যমে আচরণবিধি লঙ্ঘনের মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সমবায় অধিদপ্তর, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সচেতন নাগরিক সমাজ। তাকে অবিলম্বে সাময়িক বরখাস্ত করে উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। (এই সিন্ডিকেটের বাকি সদস্যদের অন্ধকার আমলনামা নিয়ে ‘অপরাধ বিচিত্রা’র আগামী সংখ্যায় চোখ রাখুন)



