
বিশেষ প্রতিনিধি
রক্তাক্ত ভিকটিমদের আর্তনাদ, আদালতের আইনি নির্দেশনা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের সমস্ত দাবিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চিহ্নিত আওয়ামী হামলাকারীদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একটি অসাধু চক্র। ডিএমপির উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ, গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং অনৈতিক সুবিধা লেনদেনের মাধ্যমে ডিএমপির শীর্ষ এক কর্মকর্তার নির্দেশে রমনা থানা পুলিশ মূল অপরাধীদের সুরক্ষা দিতে এক নির্লজ্জ খেলায় মেতেছে। সুনির্দিষ্ট রক্তাক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রথম মামলার চার্জশিট না দিয়ে, উল্টো আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের রক্ষায় ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধেই সাজানো কাউন্টার মামলার চার্জশিট দিয়েছে রমনা থানা পুলিশ।
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, রাজধানীর কাকরাইলস্থ কর্ণফুলী গার্ডেন সিটিতে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের প্রভাব খাটিয়ে জোরপূর্বক ফ্ল্যাট মালিক সমিতি দখলের চক্রান্ত প্রতিরোধ করায় গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে রমনা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের হয় (মামলা নং-০২/২৪, ধারা: ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩২৩/৩২৪/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৩৭৯/৩৪/৫০৬ পেনাল কোড)। উক্ত মামলার বাদী/ভিকটিম সিনিয়র সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী মোঃ সাইফুল ইসলাম সজীব, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার কারণে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে বারবার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, হয়রানি ও কারাভোগের শিকার হয়েছেন।
মূল মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন-আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমান লফিজ, যুবলীগ নেতা আলমগীর, বাড্ডা সাতারকুল ৩৮ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোকসেদ আলী, রমনা থানা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ওয়াহেদুন্নবী ভূঁইয়া, আওয়ামীপন্থী আইনজীবী শহীদুল্লাহ জাকির, আওয়ামী লীগ নেতা মেয়র রফিক কোতোয়ালের ভাই নুরুল আলম কোতোয়াল এবং যুব মহিলা লীগ নেত্রী জেরিন রহমান ইলাসহ অজ্ঞাতনামা ২০-২৫ জন।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। এই চিহ্নিত আসামিদের অধিকাংশই ছাত্র-জনতার রক্তে হাত রাঙানো খুনি। মূল মামলার ১ নং আসামি মিজানুর রহমান লফিজ ও ৬ নং আসামি নুরুল আলম কোতোয়ালের বিরুদ্ধে একাধিক থানায় এবং ২ নং আসামি ওয়াহেদুন্নবী ভূঁইয়া ও ৩ নং আসামি আলমগীরের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র-জনতা হত্যার মামলা রয়েছে।
অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ওয়াহিদুন্নবী ভূঁইয়া কোনো প্রকার আইনি তোয়াক্কা না করে নিয়মিত ডিএমপির শীর্ষ এই কর্মকর্তার সাথে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। আদালত থেকে জামিন না নেওয়া সত্ত্বেও তাঁর অবাধ যাতায়াত রয়েছে ডিএমপির শীর্ষ ওই কর্মকর্তার কার্যালয়ে। শুধু তা-ই নয়, ডিএমপির উক্ত শীর্ষ কর্মকর্তার আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে সমাজ ও লোকালয়ে প্রকাশ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এবং মামলার ভুক্তভোগীদের নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন তিনি।
অথচ এই চিহ্নিত খুনিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের কোনো ভূমিকা নেই। আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মূল মামলার ৬ নং আসামি নুরুল আলম কোতোয়াল কোনো প্রকার জামিন ছাড়াই রহস্যজনকভাবে পরের দিন (৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪) সরাসরি রমনা থানায় হাজির হন। ডিএমপির উর্ধ্বতন মহলের সবুজ সংকেতে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার না করে, উল্টো রক্তে ভেসে যাওয়া ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী সজীবের বিরুদ্ধেই একটি সাজানো কাউন্টার মামলা গ্রহণ করে (মামলা নং-০৩/২৪)।
পুলিশের এই সাজানো কাউন্টার মামলাটি যে কতটা বানোয়াট ও অসত্য, তা তাদের নিজেদের তথ্যাদি বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হয়। কাউন্টার মামলার এজাহারে বাদী নুরুল আলম কোতোয়াল দাবি করেছেন-ঘটনাটি ঘটেছে ভবনের ১০/সি নম্বর ফ্ল্যাটে, যা মূল মামলার ১ নং আসামি মিজানুর রহমান লফিজের বাসা। কিন্তু সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হলো, কাউন্টার মামলার সাক্ষীগণ পুলিশের কাছে বয়ান দিতে গিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলেছেন! তারা দাবি করেছেন, ঘটনাটি নাকি বাদী নুরুল আলম কোতোয়ালের নিজের বাসায় ঘটেছে। এজাহারের ঘটনাস্থল এবং সাক্ষীদের বয়ানের এই চরম অসঙ্গতিই প্রমাণ করে পুলিশি মদদে এটি একটি বানোয়াট নাটক। আরও আশ্চর্যের বিষয়, যে ১০/সি নম্বর ফ্ল্যাটে লুটপাটের মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেই ফ্ল্যাটের মালিক লফিজ নিজে এই মামলায় বাদী কিংবা সাক্ষী-কোনোটিই হননি।
আওয়ামী সন্ত্রাসীদের এই বর্বর হামলায় গুরুতর জখম ও রক্তাক্ত ভিকটিমগণ হলেন-২১ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো: মামুনুর রশীদ, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক মো: রাশেদুল হাসান, প্রচার সম্পাদক ইসমাইল শুভ, সদস্য মো: সালাউদ্দিন এবং পরিবাগ ইউনিটের সাংগঠনিক সম্পাদক মো: মামুন।
আহত বিএনপি নেতাদের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি, হাসপাতালের মেডিকেল রিপোর্ট ও পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ টেবিলে পচে মরছে, কিন্তু ডিএমপির এই কর্মকর্তার মদদে রমনা থানা পুলিশ মূল মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত না করে অপরাধীদের আড়াল করছে।
সংশ্লিষ্ট মামলার বিষয়ে ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানান “মামলার মেরিট অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তদন্তের ওপর আস্থা না থাকার বিষয়ে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, “যদি ওসি, ডিসি কিংবা তদন্তকারী অফিসারের প্রতি আস্থা না থাকে, তাহলে অন্য কোনো সংস্থা-যেমন সিআইডি অথবা পিবিআইকে দিয়ে তদন্ত করাতে পারেন। পুলিশ সদর দপ্তরে আবেদন জানিয়ে মামলাটি এখান থেকে স্থানান্তর করে নিন।”
পুলিশের শীর্ষ এই কর্মকর্তার এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ও দায়সারা পরামর্শে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ও বিএনপি নেতৃবৃন্দ। তারা অবিলম্বে অনিয়ম বন্ধ করে আসল অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আদালতে প্রথম মামলার চার্জশিট প্রদান এবং ছাত্র-জনতা হত্যা ও হামলার সাথে জড়িত সকল আসামিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।



