অনুসন্ধানঅভিযান

আলিশান বাড়ি, অবৈধ লেনদেনসহ একাধিক অভিযোগ, তদন্ত চলছে ওসি শরীফের বিরুদ্ধে

এম জসিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধিঃ

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ শরীফকে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় প্রত্যাহার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর অভিযোগ তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হলে তাকে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে একজন উপপুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক পক্ষপাত, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ আর্থিক লেনদেন এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তুলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি আধা সরকারি (ডিও) পত্র পাঠানো হয়। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-২ শাখা অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে নির্দেশনা পাঠায়। সেই নির্দেশনার ভিত্তিতেই সিএমপি ওসি মুহাম্মদ শরীফকে সদরঘাট থানা থেকে প্রত্যাহার করে এবং তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় মুহাম্মদ শরীফের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অবৈধ আর্থিক লেনদেন, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিল এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কর্ণফুলী থানায় দায়িত্ব পালনকাল থেকেই ওসি শরীফের বিরুদ্ধে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল। তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ, চাঁদাবাজদের ছাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, গ্রেপ্তার বাণিজ্য, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে আসে। এছাড়া বাকলিয়ার দেওয়ান বাজার এলাকায় একটি বহুতল বাড়ি নিয়ে নানা প্রশ্নও আলোচনায় আসে। বিভিন্ন সময়ে ওই সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে তিনি ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, কর্ণফুলী থানায় দায়িত্ব পালনকালে সেনাবাহিনীর অভিযানে আটক তিন চাঁদাবাজকে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। একই সময়ে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, গ্রেপ্তার বাণিজ্য, ময়নাতদন্তের নামে অর্থ আদায় এবং নদীকেন্দ্রিক চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়। এছাড়া সিআইডিতে দায়িত্ব পালনকালে বিদেশি মুদ্রা উদ্ধারের একটি মামলার আলামত সংরক্ষণে অনিয়মের অভিযোগে আদালতের নির্দেশে তাকে সশরীরে হাজির হওয়ার ঘটনাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।

সিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পরই ওসি মুহাম্মদ শরীফকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে একজন উপপুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে প্রত্যাহার হওয়া ওসি মুহাম্মদ শরীফ তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, পরিকল্পিতভাবে তাকে হেয় করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রচার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, তিনি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন এবং অতীতে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার ছবি ব্যবহার করে তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১৮ জুন সিএমপির এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডিং শাখা থেকে মুহাম্মদ শরীফকে সদরঘাট থানার ওসি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছিল। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় তাকে ওই পদ থেকে প্রত্যাহার করা হলো

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button