অনুসন্ধানঅপরাধঅব্যাবস্থাপনাঅভিযানএক্সক্লুসিভদুর্নীতি

বালুর ব্যবসা নয়, নদীভাঙনকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এক ‘তারেক ইকোনমিকস

এক ট্রাক বালুর দাম ৬ হাজার টাকা। দিনে যদি ২০–৩০ লাখ টাকার বালু বিক্রি হয়, তাহলে প্রতিদিন আনুমানিক ৩৩৩ থেকে ৫০০ ট্রাক বালু বাজারজাত হচ্ছে। মাসে সেই অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ৬ থেকে ৯ কোটি টাকা। প্রশ্ন হলো, এই বিপুল অর্থের ব্যবসায় আসলে লাভবান হচ্ছে কারা, আর সর্বস্ব হারাচ্ছে কারা?

অভিযোগ হলো, নদী থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনে খরচ প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ সেই বালু বিক্রি হচ্ছে কোটি কোটি টাকার বাজারে। একটি অংশ যায় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের পকেটে, একটি অংশ স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের হাতে, আরেকটি অংশ যায় ব্যবসায়ী চক্রের কাছে—সব পক্ষই খুশি। শুধু দুঃখী নদীর পাড়ের মানুষ।

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই বালু উত্তোলনের কারণে যাদের ঘরবাড়ি, জমিজমা ও জীবিকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে, তাদের কী হবে?

নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষ যখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে যায়, তখন তাদের বলা হয়—“ঘর করে দেব”, “বাঁধ করে দেব”, “পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করব।” এরপর সংসদে একটি বক্তব্য, এলাকায় কয়েকটি ছবি, আর জনগণের কাছ থেকে বাহবা, কাজ শেষ!

কিন্তু আসল ব্যবসা শুরু হয় এরপর।

ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ, বাঁধ নির্মাণ, পুনর্বাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নের নামে আসে প্রকল্প, আসে টেন্ডার। আর সেই টেন্ডারকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয় আরেক দফা ভাগ-বাটোয়ারার ব্যবসা। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার গুলশানকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের লোকজনও এসব প্রকল্পের সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ একই মানুষকে প্রথমে নদীভাঙনের শিকার হতে দেওয়া হয়, তারপর তার দুর্দশাকে দেখিয়ে ত্রাণ-পুনর্বাসন-ঘর-বাঁধের প্রকল্প আনা হয়, আর সেই প্রকল্পকেও বানানো হয় ব্যবসার নতুন ক্ষেত্র।

সবচেয়ে নির্মম বিষয় হলো, নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে মানুষ যখন ঢাকায় আশ্রয় নেয়, তখন তাদের একটি অংশকে সামান্য অর্থের বিনিময়ে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কোথাও ছোট দোকান বসানো হয়, কোথাও ফুটপাত বা রাস্তার পাশে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হয়; এরপর সেই দোকান ও ব্যবসাকে কেন্দ্র করে চলে চাঁদাবাজি। মানুষটি একবার নদীতে সর্বস্ব হারায়, আরেকবার শহরে এসে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হয়।

এটাই যদি হয় রাজনীতির অর্থনীতি, তাহলে এর নাম উন্নয়ন নয়, এটি একটি শোষণের চক্র।

নদী থেকে বালু → বালুর ব্যবসা → রাজনৈতিক ভাগ → প্রশাসনিক ভাগ → নদীভাঙন → মানুষের সর্বস্বান্ত হওয়া → পুনর্বাসন প্রকল্প → টেন্ডার → আবার রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ভাগ-বাটোয়ারা → ভাঙনের শিকার মানুষকে সস্তা রাজনৈতিক শ্রমে ব্যবহার → ছোট ব্যবসায় চাঁদাবাজি।

এই চক্র যতদিন চলবে, ততদিন নদীভাঙনের মানুষ শুধু ক্ষতিগ্রস্তই হবে; আর একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নদী, বালু, প্রকল্প ও মানুষের দুর্দশা, সবকিছুকে অর্থ উপার্জনের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।

বাংলাদেশে বালু উত্তোলন আইন ও অনুমোদনের আওতাধীন। অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে গবেষণায় রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি ও আইন প্রয়োগের ঘাটতির বিষয়ও উঠে এসেছে। অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলন নদীর তীর, কৃষিজমি, জীবিকা ও পরিবেশের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই প্রশ্ন শুধু—“বালু কে তুলছে?” প্রশ্ন হওয়া উচিত:-

কার অনুমতিতে তুলছে? কত পরিমাণ তুলছে?
কত ট্রাক বের হচ্ছে? কোথায় বিক্রি হচ্ছে প্রতিদিন কত টাকা লেনদেন হচ্ছে? সরকার কত রাজস্ব পাচ্ছে? আর নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষতিপূরণ কোথায়?

প্রয়োজনে প্রতিটি ড্রেজারের অবস্থান, উত্তোলনের পরিমাণ, ট্রাক চলাচল, বালুর বিক্রির হিসাব, ইজারা ও অনুমোদন, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার, সবকিছুর স্বাধীন অডিট ও তদন্ত করতে হবে।

নদী জনগণের সম্পদ। নদীর বালু কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। মানুষের দুর্দশাকে পুঁজি করে কেউ যদি বালুর ব্যবসা, টেন্ডার ব্যবসা এবং চাঁদাবাজির একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলে, সেই চক্র ভাঙতেই হবে।

বালু লুট বন্ধ করতে হবে। নদীভাঙন রোধে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা নিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে পুনর্বাসন করতে হবে। টেন্ডার বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। চাঁদাবাজির রাজনীতি বন্ধ করতে হবে।

নইলে নদী ভাঙবে, মানুষ সর্বস্ব হারাবে, আর কিছু মানুষ সেই ভাঙন থেকেই কোটি কোটি টাকা আয় করবে। এই চক্রই ভাঙতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button