অনুসন্ধানঅপরাধঅভিযানদুর্নীতি

সীতাকুণ্ডে মাদক জুয়ার আড্ডা জানেন পুলিশ সুপার মাসুদ আলম, ম্যানেজ ওসি

সীতাকুণ্ডে প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী বিএম গেট এলাকার মীর ব্রিকফিল্ড রোডে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে কোটি কোটি টাকার জুয়া ও মাদকের আসর পরিচালিত হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিকেল থেকে শুরু হয়ে কথিত এ জুয়া-মাদকের আসর চলে পরদিন ভোর পর্যন্ত। প্রতিদিন সেখানে বিপুলসংখ্যক জুয়াড়ির সমাগম হয় এবং লাখ লাখ থেকে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়ে থাকে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। মীর ব্রিকফিল্ড রোডের একেবারে শেষ প্রান্তে গোয়ালিনী ফ্যাক্টরির পাশের একটি মুরগির খামারসংলগ্ন এলাকায় এ আসর বসে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এ মাদক জুয়ার আসর পরিচালনার সঙ্গে রবিউল ও ইব্রাহিম নামে দুই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তাদের দাবি, প্রতিদিন বিকেল প্রায় ৩টা থেকে শুরু হয়ে ভোর ৬টা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের জুয়ার খেলা চলে। ফেলাশ, রুলেট, ব্ল্যাকজ্যাক, কাইট, পয়সা খেলা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের জুয়ার আয়োজন রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন সেখানে ১৭০ থেকে ২০০ জনেরও বেশি জুয়াড়ি জড়ো হন। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে সেখানে এসে জুয়ায় অংশ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগ শুধু জুয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয়দের দাবি, জুয়া-মাদকের আসরকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় মাদকের বেচাকেনাও বিস্তার লাভ করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তি, চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পলাতক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের আনাগোনার অভিযোগও রয়েছে। এলাকাবাসীর কেউ কেউ দাবি করেছেন, জুয়ার আসরটি অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির যাতায়াত রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কসহ বিভিন্ন স্থানে ডাকাতির পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, জুয়া-মাদকের আসরের পাশেই থাকা দুটি ঘরে দেশীয় অস্ত্র মজুদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটি ‘বুড়ির ঘর’ এবং একটি গরুর ঘরে অস্ত্র রাখা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। এলাকাবাসীর দাবি, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষভাবে তল্লাশি ও তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, এ জুয়া-মাদকের আসরকে ঘিরে এলাকার অপরাধপ্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জুয়া ও মাদকের কারণে যুবসমাজের একটি অংশ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। পাশাপাশি চুরি, ছিনতাই, মাদকসেবন, কিশোর অপরাধসহ বিভিন্ন অপরাধ বৃদ্ধির আশঙ্কাও করছেন তারা। তাদের দাবি, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এদিকে জুয়া-মাদকের আসরের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে বদিউল নামে এক সচেতন নাগরিক মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জুয়া ও মাদকের আসরের ভিডিও ধারণের সময় তাকে মারধর করা হয় এবং তার সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা কেড়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বলে দাবি স্থানীয়দের। এলাকাবাসীর একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জুয়া-মাদকের আসর চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাদের দাবি, একাধিকবার বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা হলেও স্থায়ীভাবে আসর বন্ধ করা যায়নি। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় একটি জুয়া-মাদকের আসর যদি প্রতিদিন বিকেল থেকে ভোর পর্যন্ত চলে, তাহলে সেটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরের বাইরে থাকে কীভাবে? স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে সীতাকুণ্ড থানার অফিসার ইনচার্জের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে হোয়াটসঅ্যাপে জানান, তিনি কয়েকবার জুয়া-মাদকের আসরে অভিযান পরিচালনা করেছেন। একই সঙ্গে প্রতিবেদককে সঙ্গে নিয়ে আবারও অভিযান পরিচালনার কথা বলেন। অন্যদিকে সীতাকুণ্ড থানার এসআই সুজাউদ্দৌলা প্রতিবেদককে ফোন করে জানান, তিনি অভিযানে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য প্রয়োজন হতে পারে এবং আসরে মাদক বিক্রেতা ও জুয়াড়িদের দেখা গেছে। এই বক্তব্যের সঙ্গে ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির বর্তমান ইনচার্জের বক্তব্যে পার্থক্য দেখা যায়। ফাঁড়ির ইনচার্জ প্রতিবেদককে জানান, সেখানে কোনো জুয়া চলে না এবং যে ভিডিও দিয়ে সংবাদ করা হয়েছে, সেগুলো অনেক পুরোনো। একই ঘটনায় পুলিশের দুই ধরনের বক্তব্য স্থানীয়দের মধ্যে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যদি সেখানে কোনো জুয়া না চলে, তাহলে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগের ভিত্তি কী? আবার যদি সেখানে জুয়া ও মাদকের কার্যক্রম থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে কার্যকর ও স্থায়ী অভিযান কেন হচ্ছে না? স্থানীয়দের দাবি, এসব প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনের পক্ষ থেকেই পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এদিকে অভিযোগ উঠেছে, পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করেই এ জুয়া-মাদকের আসর পরিচালিত হচ্ছে। এমন অভিযোগ অবশ্য পুলিশের পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়নি । স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন, প্রশাসনের সঙ্গে কথিত প্রভাবশালী যোগাযোগের কারণে আসরটি দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের কাছে বিস্তারিত জানতে একাধিক প্রশ্ন পাঠানো হয়। প্রশ্নগুলোর মধ্যে ছিল-মীর ব্রিকফিল্ড রোডে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে জুয়া বসার অভিযোগ সম্পর্কে পুলিশ অবগত কি না, প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কথিত আসর চলার বিষয়ে পুলিশের নজরদারি আছে কি না, রবিউল ও ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে কোনো তথ্য বা মামলা রয়েছে কি না, সেখানে শত শত লোক কীভাবে জড়ো হচ্ছে, দেশীয় অস্ত্র মজুদের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করবে কি না এবং অভিযোগ সত্য হলে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জবাবে পুলিশ সুপার প্রতিবেদককে সীতাকুণ্ড থানার অফিসার ইনচার্জের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। পাশাপাশি তিনি জানান, তিনি বিষয়টি ওসিকে জানিয়েছেন এবং দ্রুত জুয়া ও মাদকের আসর ধ্বংস করার কথা বলেছেন। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, পুলিশ সুপারের এমন আশ্বাসের পরও কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও জুয়া-মাদকের আসরের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা দেখা যায়নি। ফলে সচেতন মহলের প্রশ্ন, প্রশাসনের আশ্বাসের পরও যদি আসর বন্ধ না হয়, তাহলে এর পেছনে কি কোনো প্রভাবশালী মহলের হাত রয়েছে? নাকি অভিযোগগুলোই ভিত্তিহীন? বিষয়টি পরিষ্কার করতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। অভিযোগের বিষয়ে রবিউল ও ইব্রাহিমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। এদিকে স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, আগেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে জুয়া-মাদকের আসর নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি সংবাদ প্রকাশের পর পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার না করে ফিরে আসার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, জুয়া-মাদকের আসরে নিয়মিত বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি থাকলে সেটি কোনো গোপন আসর নয়। বরং প্রকাশ্যেই যদি এমন কার্যক্রম চলে থাকে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি আরও জোরদার হওয়া উচিত। তারা দাবি করেছেন, শুধু একদিন অভিযান চালিয়ে চলে গেলে হবে না; নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সচেতন মহলের মতে, জুয়া ও মাদক কোনো এলাকার জন্য শুধু সামাজিক সমস্যা নয়; এর সঙ্গে অপরাধ, অর্থনৈতিক ক্ষতি, পারিবারিক অশান্তি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই একটি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ থাকলে বিষয়টি হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এখন মূল প্রশ্ন-মীর ব্রিকফিল্ড রোডে আসলেই কি কোটি টাকার জুয়া ও মাদকের আসর চলছে? সেখানে কি দেশীয় অস্ত্র মজুদের অভিযোগের সত্যতা রয়েছে? কারা পরিচালনা করছে কথিত এ আসর? কারা সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করছে? আর এত বড় একটি কার্যক্রম সত্য হলে প্রশাসনের নজরদারির বাইরে থাকছে কীভাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ। স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগ সত্য হলে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মহলের পরিচয় বিবেচনা না করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও জনগণের সামনে পরিষ্কার করা উচিত। কারণ, দীর্ঘদিনের অভিযোগ, পুলিশের কাছে পাঠানো প্রশ্ন, পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া অভিযানের আশ্বাস এবং পরবর্তী নীরবতা-সব মিলিয়ে সীতাকুণ্ডের মীর ব্রিকফিল্ড রোডের জুয়া-মাদকের আসর এখন শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের নয়, সচেতন মহলেরও নজরে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়, নাকি বিষয়টি আবারও আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button