
রাশেদুল ইসলাম :
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে বর্তমানে কর্মরত উপসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে ঘিরে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদ পাওয়ার জন্য বিপুল অর্থের কথিত লেনদেনের অভিযোগ সামনে এসেছে। ডেইলি ওয়াদা-র হাতে আসা বিভিন্ন চুক্তিপত্র, ব্যাংক চেক ও ব্যক্তিগত বার্তার ভিত্তিতে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কাঙ্ক্ষিত সরকারি পদ পাওয়ার জন্য কোটি কোটি টাকার আর্থিক ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তবে এসব নথি থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে অর্থ দিয়ে সত্যিই কোনো সরকারি পদ কেনা হয়েছিল। নথিতে থাকা কিছু দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলোর একটি হলো চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক পদকে কেন্দ্র করে ৭০ কোটি টাকার কথিত একটি চুক্তি। ওই চুক্তিতে পদটি পেলে ১৮ মাসের মধ্যে ‘কাজের মাধ্যমে’ ১৪০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
৪ কোটি টাকার চেক ও চট্টগ্রাম বন্দর
নথিপত্র অনুযায়ী, গত বছরের ২৪ নভেম্বর সালাহউদ্দিন আহমেদ ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা আহমেদ শাকিল খানের সঙ্গে ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি চুক্তি করেন।
চুক্তিতে ৪ কোটি টাকা ঋণের কথা উল্লেখ ছিল। এর বিপরীতে নিরাপত্তা হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমেদের সিটি ব্যাংকের দুটি অ্যাকাউন্টের ২ কোটি টাকা করে মোট ৪ কোটি টাকার দুটি চেক দেওয়া হয় বলে নথিতে দেখা যায়।
এর কিছুদিন পর, ১৭ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে পরিচালক পদে বদলির আদেশ দেয় এবং ২৩ ডিসেম্বর তিনি সেখানে যোগ দেন।
তবে পরে জানা যায়, পরিচালক পদে কোনো শূন্য পদ ছিল না। ফলে ৮ জানুয়ারি তাকে প্রশাসনিক কারণে কন্ট্রোলার অব স্টোরস পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় কী ছিল?
এরপর সালাহউদ্দিন আহমেদ ও এক অজ্ঞাত ব্যক্তির কথিত হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথন সামনে আসে। সেখানে তিনি প্রত্যাশিত পদ না পাওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বার্তায় তিনি জানান, তাকে একটি নির্দিষ্ট পদ দেওয়ার কথা থাকলেও পরে অন্য একটি পদে দেওয়া হয়েছে। একই কথোপকথনে তিনি ওই নিয়োগের ব্যবস্থা কে করেছিলেন সে সম্পর্কেও জানেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
তবে এসব হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে নিশ্চিত তথ্য নেই।
চট্টগ্রামের ডিসি হওয়ার জন্য ৭০ কোটি টাকার কথিত চুক্তি
নথিপত্র অনুযায়ী, ২৯ মার্চ সালাহউদ্দিন আহমেদ একটি লিখিত ঘোষণায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেলে সেখানে দায়িত্ব পালনে তার কোনো আপত্তি নেই বলে উল্লেখ করেন।
একই নথিপত্রে পটুয়াখালীর বাউফলের মো. হাবিবুর রহমানকে তার প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এরপর আসে সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযোগটি।
১৬ জুলাই তারিখের একটি নথিতে সালাহউদ্দিন আহমেদের কথিত স্বাক্ষর রয়েছে এবং সেখানে চট্টগ্রামের ডিসি পদ পাওয়ার সঙ্গে ৭০ কোটি টাকার একটি চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তিনি ওই পদ পেলে ১৮ মাসের মধ্যে ‘কাজের মাধ্যমে’ ১৪০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে ‘কাজের মাধ্যমে’ কীভাবে এই অর্থ উপার্জন করা সম্ভব ছিল, এর আইনি ভিত্তি কী এবং শেষ পর্যন্ত কারা এই অর্থ পাওয়ার কথা ছিল—এসব বিষয়ে নথিতে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।
কোটি কোটি টাকার চেক
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, এসব কথিত ব্যবস্থার সঙ্গে আর্থিক নিশ্চয়তা হিসেবে বিপুলসংখ্যক চেক দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
নথি অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের মোট ১২টি চেকের মূল্য ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের বগুড়া কর্পোরেট শাখার পাঁচটি চেকের মোট মূল্য ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং সিটি ব্যাংকের সাতটি চেকের মোট মূল্য ৫ কোটি টাকা।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে সালাহউদ্দিন আহমেদের সরকারি সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত সার্ভিস প্রোফাইল এবং তার বোন জিনিয়াত খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপিও দেওয়া হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সালাহউদ্দিন আহমেদ শুরুতে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তার ফোন হ্যাক করা হয়েছিল এবং তার চেক ও জাতীয় পরিচয়পত্র হারিয়ে গিয়েছিল।
তবে তিনি স্বীকার করেন যে এসব ঘটনার বিষয়ে তিনি পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি।
তিনি বলেন, এসব বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, অথচ নেওয়া উচিত ছিল—এটি তার ভুল।
পরে তিনি আমলাতন্ত্রের ভেতরে এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়ার প্রবণতা নিয়েও কথা বলেন। তার দাবি, সচিবালয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী কর্মকর্তাদের কাছে নানা ধরনের প্রস্তাব নিয়ে নিয়মিত ঘোরাফেরা করে এবং এ ধরনের ঘটনা এখনও ঘটছে।
তবে তার বক্তব্যকে কোনো সরকারি পদ কেনাবেচার অভিযোগের স্বীকারোক্তি হিসেবে প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।
তদন্ত শুরু করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, একটি অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বার্থে তদন্ত কমিটির সদস্যদের নাম প্রকাশ করতে তিনি রাজি হননি।
সব মিলিয়ে, নথিপত্রে উঠে আসা অভিযোগগুলো সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগকে ঘিরে কথিত অর্থের লেনদেন ও প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুতর চিত্র তুলে ধরেছে। তবে চেক বা কোনো চুক্তিপত্র থাকলেই অর্থ বাস্তবে লেনদেন হয়েছে বা কোনো পদ অর্থের বিনিময়ে দেওয়া হয়েছে—এমনটা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় না। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।



