চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষায় প্রশ্নের মুখে প্রশাসন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্যের অভিযোগ

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রাম মানেই পাহাড়, সমুদ্র আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয়। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নগরীর সৌন্দর্য ও পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এখানকার পাহাড়গুলো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পাহাড়ই যেন পরিণত হয়েছে একটি বড় ধরনের বাণিজ্যিক টার্গেটে। বছরের পর বছর ধরে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে বসতি, স্থাপনা এবং প্লট তৈরির অভিযোগ উঠলেও কার্যকরভাবে পাহাড় রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকরা। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পাহাড় কেটে জমি সমতল করা হচ্ছে। এরপর সেই জমিকে প্লটে ভাগ করে উচ্চমূল্যে বিক্রির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। কোথাও আবার পাহাড়ের পাদদেশে টিনের ঘেরাও দিয়ে শুরু হচ্ছে দখল ও সমতল করার কাজ। প্রথমে ছোট পরিসরে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেটে ফেলা হচ্ছে পাহাড়ের বড় একটি অংশ। একপর্যায়ে সেখানে তৈরি হচ্ছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ভবন কিংবা বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা।চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ বোস্তামী, খুলশী, আকবর শাহসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কাটার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে অনেক সময় পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু সচেতন মহলের প্রশ্ন-এসব অভিযান কি পাহাড় রক্ষায় স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে, নাকি সংবাদ প্রকাশের পর সাময়িকভাবে পরিচালিত ‘লোক দেখানো’ অভিযানেই সীমাবদ্ধ থাকছে? একসময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে দলটির রাজনৈতিক অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকায় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে পাহাড় কেটে বাণিজ্য ও স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছিল। তখনও গণমাধ্যমে একের পর এক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদ প্রকাশের পর পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনার ঘটনাও দেখা গেছে।বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে। বিএনপি দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে রয়েছে। কিন্তু সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পালাবদলের পরও চট্টগ্রামের পাহাড় কাটার চিত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। বরং বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পরিচয় দেওয়া কোনো কোনো ব্যক্তি বা নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে।অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিগত ভূমিকা, সম্পৃক্ততা এবং দায় নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় যেন কোনোভাবেই পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। ‘জনসেবা’র রাজনীতি নাকি পাহাড় কেটে পকেট ভারী করার রাজনীতি? একাধিক বারংবার প্রশ্ন নগরবাসীর। রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য-এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের। একজন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীর কাছে জনগণের প্রত্যাশা থাকে জনসেবা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সরকারি সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য নগরী নিশ্চিত করা। চট্টগ্রামের পাহাড় শুধু কোনো ব্যক্তির সম্পদ নয়; এগুলো নগরীর প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের কেউ কেউ রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে এসব পাহাড়ের ওপর নজর দিচ্ছেন। পাহাড় কেটে সমতল করা হচ্ছে, এরপর সেই জমি প্লট আকারে বিক্রির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন-যারা মানুষের ভোট নিয়ে জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেন, তারা যদি মানুষের সম্পদ, সরকারি জমি ও পরিবেশ রক্ষার পরিবর্তে পাহাড় ধ্বংসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে সাধারণ মানুষ কার কাছে যাবে? সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা পড়ল আকবর শাহের সুপারি বাগান এলাকার চিত্র, সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগরীর আকবর শাহ এলাকার সুপারি বাগান এলাকায় পাহাড় কাটার একটি চিত্র স্থানীয়ভাবে ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সেখানে একটি বিশাল অংশ প্রথমে টিন দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ঘেরাওয়ের আড়ালে ধীরে ধীরে পাহাড় কেটে জায়গাটি সমতল করার কাজ চলছে।স্থানীয়দের আশঙ্কা, পাহাড় কেটে জায়গাটি সমতল করার পর সেখানে প্লট তৈরি করে উচ্চমূল্যে বিক্রির চেষ্টা হতে পারে। অত্র সরকারি স্থানটি বিক্রয় করে মনির নামের একজন ভুমিদস্যু ,কামরুলের কাছে কামরুল সময়সূচীকে পুরো পাহাড়টি কেটে সমতল করে ফেলেছেন।ঘটনাস্থলের চিত্র যদি সত্যিই পাহাড় কাটার প্রমাণ বহন করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করা। জমিটির মালিকানা কার, সেটি সরকারি খাস জমি কি না, সেখানে কোনো বৈধ অনুমোদন রয়েছে কি না এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র বা অন্য কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না-এসব বিষয়ও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা জরুরি।কারণ একটি পাহাড় একবার কেটে ফেলা হলে সেটি শুধু মাটি সরিয়ে ফেলার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জলাধারণ ক্ষমতা, ভূমিধসের ঝুঁকি এবং নগরীর সামগ্রিক ভারসাম্যের বিষয়।সংবাদ প্রকাশের পরই কেন নড়েচড়ে বসে প্রশাসন? চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠছে অভিযান পরিচালনার সময় ও কার্যকারিতা নিয়ে।সচেতন মহলের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে পাহাড় কাটার ঘটনা যখন চলমান থাকে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে না। কিন্তু কোনো সাংবাদিক ঘটনাস্থলে গিয়ে ছবি বা ভিডিও ধারণ করে সংবাদ প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরগুলো নড়েচড়ে বসে। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযান পরিচালনা করেন। প্রশ্ন হচ্ছে-প্রশাসনের নিজস্ব নজরদারি ব্যবস্থা কোথায়?পাহাড় কাটা যদি দিনের পর দিন চলতে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসন, ভূমি অফিস, পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা অন্যান্য দপ্তরের নজরে তা আগে আসে না কেন?একটি পাহাড় যখন কাটা শুরু হয়, তখন সেটি একদিনে শেষ হয়ে যায় না। দিনের পর দিন শ্রমিক, যন্ত্রপাতি, ট্রাক কিংবা অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করে মাটি সরানোর কাজ চলে। তাহলে সংবাদ প্রকাশের আগে প্রশাসনের নিজস্ব গোয়েন্দা ও নজরদারি ব্যবস্থা কেন কার্যকর হয় না-এ প্রশ্নই এখন সাধারণ মানুষের।অভিযান হয়, জরিমানা হয়-কিন্তু পাহাড় কাটা বন্ধ হয় কি?অভিযান পরিচালনার পর অনেক সময় জরিমানা বা মামলা করার কথা জানা যায়। কিন্তু সচেতন মহলের অভিযোগ, পাহাড় কাটার পরিমাণের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ এত কম থাকে যে, পাহাড় কেটে কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনার তুলনায় সেই জরিমানা কার্যত কোনো বড় বাধা সৃষ্টি করে না।ফলে যারা পাহাড় কেটে ব্যবসা করার সঙ্গে জড়িত, তাদের মধ্যে আইনকে ভয় করার পরিবর্তে এক ধরনের ‘ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করার’ মানসিকতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন পরিবেশ সচেতন নাগরিকরা।তাদের প্রশ্ন-একটি বিশাল পাহাড় কেটে যদি কেউ বিপুল অর্থ উপার্জনের সুযোগ পায়, আর ধরা পড়লে তুলনামূলকভাবে সামান্য জরিমানা দিয়েই পার পাওয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে পাহাড় কাটার প্রবণতা কীভাবে বন্ধ হবে?আইন যদি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়, পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং সরকারি জমি দখলের চেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হয়-তাহলেই পাহাড় রক্ষার ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হতোতে পাওয়া গেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ তাকে আটক করে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠায়-এমন ঘটনাও রয়েছে। যদিও পাহাড় কাটার পরিবেশগত ও পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।পুলিশ ধরে মামলা দেয়, কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা কোথায়? পাহাড় কাটার সময় কাউকে হাতেনাতে পাওয়া গেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ তাকে আটক করে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠায়-এমন ঘটনাও রয়েছে। যদিও পাহাড় কাটার পরিবেশগত ও আইনগত বিষয়টি নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা রয়েছে।সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তরকে কোনো পাহাড় কাটার বিষয়ে জানানো হলে অনেক সময় অভিযোগ দিতে বলা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে-একটি পাহাড় যখন চোখের সামনে কেটে ফেলা হচ্ছে, তখন সাধারণ নাগরিক বা সাংবাদিককে শুধু অভিযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে না রেখে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ঘটনাস্থলে যেতে পারেন না?পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে পাহাড় রক্ষা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত মাঠপর্যায়ে নজরদারি, দ্রুত অভিযান, কার্যকর মামলা এবং আইন অনুয চট্টগ্রাম মহানগরীতে গত কয়েক দশকে বিপুলসংখ্যক পাহাড়ের অস্তিত্ব কমে গেছে। বিভিন্ন সময়ে পাহাড় কাটার কারণে নগরীর প্রাকৃতিকায়ী কঠোর শাস্তি।সচেতন মহলের দাবি, চট্টগ্রাম মহানগরীতে গত কয়েক দশকে বিপুলসংখ্যক পাহাড়ের অস্তিত্ব কমে গেছে। বিভিন্ন সময়ে পাহাড় কাটার কারণে নগরীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে আবাসিক এলাকা, ভবন, রাস্তা ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও পাহাড়ের একাংশ কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে, কোথাও কেটে জমি সমতল করা হয়েছে, আবার কোথাও পাহাড়ের পাদদেশে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে।পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে বৃষ্টির সময় পানি দ্রুত নেমে আসতে পারে এবং পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে নগরীর তাপমাত্রা, জলাধারণ ক্ষমতা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।পাহাড় কাটার সঙ্গে সরকারি জমি দখলের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। কোনো পাহাড় বা জমি যদি সরকারের মালিকানাধীন হয়, তাহলে সেখানে টিনের ঘেরাও, মাটি কাটা, প্লট তৈরি কিংবা স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ কীভাবে নেওয়া হচ্ছে-এটি খতিয়ে দেখা জরুরি।সরকারি জমি দখলের চেষ্টা যদি সত্যিই হয়ে থাকে, তাহলে শুধু পাহাড় কাটার অংশটুকু নয়, পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে কারা জড়িত, কার নির্দেশে কাজ হচ্ছে, কারা অর্থ বিনিয়োগ করছে এবং কারা জমি বিক্রির সঙ্গে যুক্ত-এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা দরনাকারী, অর্থদাতা, জমি দখলকারী এবং অবৈধভাবে প্লট বিক্রির সঙ্গে জকার।কারণ শুধু শ্রমিক ধরে বা জরিমানা করে পাহাড় রক্ষা সম্ভব নয়। মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা, জমি দখলকারী এবং অবৈধভাবে প্লট বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ- নয়। অতীতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে পরিবেশ ধ্বংস ও ভূমি দখলেরতদন্ত হবে কি? পাহাড় কাটার সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করার অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে পরিবেশ ধ্বংস ও ভূমি দখলের অভিযোগ উঠেছে।বর্তমানেও যদি একই ধরনের অভিযোগ কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠে, তাহলে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা উচিত।কোনো ব্যক্তি সত্যিই কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি না, তিনি সংগঠনের কোনো পদে আছেন কি না, কিংবা তার রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে কি না-এসব বিষয়ও যাচাই করা দরকার। রাজনীতি কারও জন্য আইন ভঙ্গের লাইসেন্স হতে পারে না। ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি শুধু দখলদারদের পরিচয় বদলে যায়, কিন্তু সরকারি সম্পদ দখল ও পাহাড় কাটার সংস্কৃতি একই থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় থাকবে?পাহাড় কাটার সঙ্গে প্রশাসনের কোনো কোনো কর্মকর্তার যোগসাজশ বা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও সচেতন মহল ও নগরবাসীর মধ্যে রয়েছে। তবে এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং এর সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।কোনো কর্মকর্তা যদি সত্যিই অবৈধ পাহাড় কাটা বা সরকারি জমি দখলের বিষয় জেনেও ব্যবস্থা না নেন, কিংবা কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আবার অভিযোগটি যদি ভিত্তিহীন হয়, তাহলেও তদন্তের মাধ্যমে সেটি পরিষ্কার করা দরকার। কারণ প্রশাসনের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মধ্যে ঘুরতে থাকলে প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।সচেতন নাগরিকদের কেউ কেউ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় মাদকসহ নানা অপরাধের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে কোনো কোনো দুর্গম পাহাড়ি এলাকা অপরাধীদের গোপন কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেটিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খতিয়ে দেখা দরকার।মাদক বিক্রি বা অপরাধের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি, সংগঠন কিংবা প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে সেটিও তদন্তের দাবি রাখে। তবে প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা নয়; বরং সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই হওয়া উচিত।
পাহাড় কেটে একটি প্লট তৈরি করা হয়তো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে একটি ব্যবসায়িক সাফল্য। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় পুরো নগরবাসীকে।পাহাড় কাটা হলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার স্বাভাবিক ব্যবস্থা নষ্ট হয়। মাটির স্থিতিশীলতা কমে যায়। পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ে। প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়। নগরীর সৌন্দর্য নষ্ট হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সম্পদ ক্রমেই সংকুচিত হয়।আজ যে পাহাড় কেটে একটি প্লট বিক্রি করা হচ্ছে, কয়েক বছর পর সেই পাহাড়ের অস্তিত্বই হয়তো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।এখনই কঠোর পদক্ষেপ না ন তৈরি হয়নি। শত শত বছর ধরে প্রকৃতির নিয়মে গড়ে ওঠা এসব পাহাড় মানুষের কয়েক বছরের লোভ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ধ্বংসিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কী পাবে?চট্টগ্রামের পাহাড় একদিনে তৈরি হয়নি। শত শত বছর ধরে প্রকৃতির নিয়মে গড়ে ওঠা এসব পাহাড় মানুষের কয়েক বছরের লোভ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে-এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতায় চট্টগ্রামের পাহাড়ের ছবি দেখপ্রয়োজন স্থায়ী নজরদারি। শুধু জরিমানা নয়-প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ। শুধু শ্রমিক আটক নয়-প্রয়োজন মূল হোতাদের শনাক্ত করা। শুধু পাহাড় কাটা বন্ধের নির্দেশ নয়-প্রয়োজন কবে, বাস্তবে নয়।তাই শুধু সংবাদ প্রকাশের পর অভিযান নয়-প্রয়োজন স্থায়ী নজরদারি। শুধু জরিমানা নয়-প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ। শুধু শ্রমিক আটক নয়-প্রয়োজন মূল হোতাদের শনাক্ত করা। শুধু পাহাড় কাটা বন্ধের নির্দেশ নয়-প্রয়োজন কাটা পাহাড় পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ।পাহাড় কাটার ঘটনা প্রশাসনের নিজস্ব নজরদারিতে আগে ধরা পড়ে না কেন?সাংবাদিকরা সংবাদ প্রকাশ করার পরই কেন অনেক ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনা করা হয়?পাহাড় কেটে প্লট তৈরির পেছনে কারা অর্থ বিনিয়োগ করছে?সরকারি জমিতে টিনের ঘেরাও বা দখলের চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?পাহাড় কাটার পরিমাণের তুলনায় জরিমানার পরিমাণ যথেষ্ট কি না?পাহাড় কাটার সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে কি?কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা করলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
ইতোমধ্যে কেটে ফেলা পাহাড়গুলো পুনরুদ্ধারে কোনো কার্যকর পরিকল্পনা রয়েছে কি?চট্টগ্রামের অবশিষ্ট পাহাড়গুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা কেন আরও জোরদার করা হবে না?ভবিষ্যতে পাহায় চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। জেলা প্রশাসন, সিটি প্রশাসন, ভূমি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে সমাড় কাটার ঘটনা বন্ধে প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কীচট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষার জন্য শুধু পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। জেলা প্রশাসন, সিটি প্রশাসন, ভূমি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। দলের নাম বা পদ ব্যবহার করে কেউ যদি সরকারি জমি দখল, পাহাড় কাটা কিংবা পরিবেশ ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির তৈরিামের একের পর এক পাহাড় কেটে সমতল করা হচ্ছে-এমন অভিযোগ যদি সত্য হয় করতে হবে।কারণ চট্টগ্রামের পাহাড় কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। কোনো ব্যক্তির নয়। কোনো ভূমিদস্যুর নয়। এই পাহাড় চট্টগ্রামের মানুষের, দেশের সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ।একদিকে পাহাড় রক্ষার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে চোখের সামনে পাহাড় কেটে প্লট তৈরির অভিযোগ উঠছে। সংবাদ প্রকাশের পর অভিযান হচ্ছে, কিন্তু আবার অন্য কোথাও নতুন করে পাহাড় কাটার অভিযোগ সামনে আসছে।নাকি সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদেরই প্রতিটি পাহাড় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে একসময় হয়তো পাহাড় রক্ষার কথা বলাড়ের পাহারাদার হতে হবে চট্টগ্রামের সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে একসময় হয়তো পাহাড় রক্ষার কথা বলার মতো পাহাড়ই থাকবে না।তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সচেতন নাগরিকদের দাবি-অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হোক। সরকারি জমির মালিকানা যাচাই করা হোক। পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হোক। রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থ কিংবা প্রভাব-কোনো কিছুই যেন আইনের পথে বাধা না হয়। যারা পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো পাহাড় কাটার সাহস কেউ-প্রশাসন কি শুধু সংবাদ প্রকাশের পর অভিযান চালিয়েই দায় শেষ করবে, নাকি সত্যিকার না পায়, সে ধরনের কার্যকর নজরদারি ও শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।চট্টগ্রামের পাহাড় বাঁচলে চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাঁচবে। পাহাড় বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে। আর পরিবেশ বাঁচলে বাঁচবে নগরবাসী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।এখন দেখার বিষয়-প্রশাসন কি শুধু সংবাদ প্রকাশের পর অভিযান চালিয়েই দায় শেষ করবে, নাকি সত্যিকার অর্থে চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষায় স্থায়ী ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে?



