চট্টগ্রামে ব্যবসায়ী ও বন্ধুকে তুলে ১৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, এসিসহ ৩ পুলিশ প্রত্যাহার

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম নগরে ব্যবসায়ী ও তাঁর বন্ধুকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে প্রায় ১৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নগর পুলিশের লং রেঞ্জ ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ক্রাইম (এলআইসি) শাখার এক সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) ও দুই সহকারী উপপরিদর্শককে (এএসআই) দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
প্রত্যাহার হওয়া কর্মকর্তারা হলেন নগর পুলিশের এলআইসি শাখার সহকারী পুলিশ কমিশনার শরীফুল আলম চৌধুরী, এএসআই বশির উদ্দিন এবং রেশন শাখার এএসআই মো. সুফিয়ান। তাঁদের মধ্যে এসি শরীফুল আলম চৌধুরীকে নগর পুলিশের সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। আর দুই এএসআইকে দামপাড়া পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী তাঁদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়ার আদেশ দেন। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। নগর পুলিশের উপকমিশনার (পিএমও) মো. বদরুজ্জামানকে ওই তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৪ সেপ্টেম্বর। ওই দিন চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর থানার কে-ব্লক এলাকা থেকে ব্যবসায়ী আখতারুজ্জামান শাকিল ও তাঁর বন্ধু মো. মনসুরকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন শাকিল।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের কাছে আগে থেকেই তথ্য ছিল যে শাকিল অনলাইন জুয়ার একজন এজেন্ট। তাঁর মুঠোফোনে বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি বা বাইন্যান্স ডলার রয়েছে-এমন তথ্যও পুলিশের কাছে ছিল বলে জানা গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, শাকিল ও তাঁর বন্ধুকে পরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কার্যালয়ের নিচতলায় অবস্থিত এলআইসি শাখায় নিয়ে যাওয়া হয়।সেখানেই তাঁদের সঙ্গে টাকার বিষয়ে দর-কষাকষি করা হয় বলে অভিযোগ।প্রথমে দাবি করা হয় এক কোটি টাকা
শাকিলের অভিযোগ, এলআইসি শাখায় নেওয়ার পর এসি শরীফুল আলম চৌধুরী তাঁর কাছে প্রথমে এক কোটি টাকা দাবি করেন। বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করার পর তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বলে জানান শাকিল।পরে কয়েক দফা দর-কষাকষির পর তাঁর মুঠোফোনে থাকা বাইন্যান্স ডলার এবং নগদ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।শাকিলের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর মুঠোফোনে থাকা সাড়ে ১২ হাজার বাইন্যান্স ডলার এবং নগদ ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়।তবে তাঁর অভিযোগ, এই অর্থ নেওয়ার প্রক্রিয়াটি শুধু নগদ টাকা গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট থেকে একাধিক দফায় ডলার অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়। পাশাপাশি ব্যাংক ও এটিএমের মাধ্যমেও টাকা নেওয়া হয়।শাকিলের অভিযোগ, তাঁকে আটকে রাখার পর প্রথমে তাঁর বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট থেকে তিন দফায় মোট সাড়ে ১০ হাজার ডলার অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়।এরপর সিটি ব্যাংকের মাধ্যমে আরও ৬ লাখ টাকা বাইন্যান্সে ডলারে রূপান্তর করে নেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।এ ছাড়া তাঁকে দামপাড়া পুলিশ লাইনের পাশের একটি ব্র্যাক ব্যাংকের এটিএম বুথে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর কাছ থেকে আরও টাকা তোলানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন শাকিল।শুধু ব্যাংক বা এটিএম নয়, আর্থিক লেনদেনের মুঠোফোনভিত্তিক অ্যাপ ব্যবহার করেও ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।সব মিলিয়ে তাঁর কাছ থেকে প্রায় ১৮ লাখ টাকা ও সমপরিমাণ সম্পদ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।শাকিলের অভিযোগ, তাঁকে পরদিন আরও পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার শর্তে তাঁর গাড়িটি হস্তান্তর করা হয়। অর্থাৎ গাড়িটি ফেরত পেলেও তাঁকে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তাঁর।এই মুঠোফোনগুলো ফেরত পাওয়ার বিষয়েও পরে তাঁকে চাপের মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেন শাকিল।
তিনি জানান, মুঠোফোনগুলোতে তাঁর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছিল। এসব ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগ তাঁর।মুঠোফোন ফেরত পাওয়ার জন্য একটি আইফোন দেওয়ার দাবি করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।আখতারুজ্জামান শাকিলের দাবি, তিনি নিয়মিত মুঠোফোনে গেম খেলেন। এটিকে অনলাইন জুয়া হিসেবে উল্লেখ করে তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয়।তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশি মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে তিনি মানসিকভাবে চাপে পড়ে টাকা দিতে বাধ্য হন।শাকিল বলেন, তাঁর মুঠোফোনে থাকা ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও নিয়ে তিনি বেশি আতঙ্কিত ছিলেন। এসব ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে দেওয়ার ভয় দেখানোয় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।তাঁর দাবি, পুরো ঘটনায় তিনি নিজের নিরাপত্তা ও সম্মান নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং চাপের মুখেই অর্থ ও অন্যান্য সম্পদ দিতে বাধ্য হয়েছেন।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের এলআইসি শাখাটি পুলিশের একটি অত্যন্ত গোপনীয় শাখা হিসেবে পরিচিত। অপরাধ শনাক্তকরণ, অপরাধ প্রতিরোধ এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ এই শাখার মাধ্যমে করা হয়সিএমপি কার্যালয়ের নিচতলায় শাখাটির অবস্থান। সেখানে প্রবেশের জন্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তির দরজা রয়েছে। ফলে অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া সেখানে প্রবেশের সুযোগ সীমিত।
এলআইসি শাখায় কর্মরত কর্মকর্তাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালনার সুযোগও নেই বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।এ কারণে অভিযোগের ঘটনাটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। একজন ব্যবসায়ী ও তাঁর বন্ধুকে কীভাবে ওই শাখায় নেওয়া হলো, কার নির্দেশে তাঁদের সেখানে নেওয়া হয়েছিল, সেখানে তাঁদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছে এবং অর্থ লেনদেনের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন-এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
অভিযোগ ওঠার পর নগর পুলিশ প্রশাসন তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে।এসি শরীফুল আলম চৌধুরীকে নগর পুলিশের সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। আর এএসআই বশির উদ্দিন ও এএসআই মো. সুফিয়ানকে দামপাড়া পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।তবে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে-এমনটি বলা যাচ্ছে না। তদন্ত কমিটির অনুসন্ধান এবং পরবর্তী প্রশাসনিক বা আইনগত পদক্ষেপের ওপর বিষয়টির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে নগর পুলিশ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। নগর পুলিশের উপকমিশনার (পিএমও) মো. বদরুজ্জামানকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে।নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।তদন্ত কমিটি অভিযোগের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখবে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও তাঁর বন্ধুকে তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া, তাঁদের কোথায় রাখা হয়েছিল, কোন কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে কীভাবে অর্থ নেওয়া হয়েছে এবং ওই অর্থ কোথায় গেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হতে পারে।একই সঙ্গে বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট থেকে ডলার স্থানান্তরের অভিযোগ, ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা রূপান্তর, এটিএম থেকে টাকা উত্তোলন এবং মুঠোফোনভিত্তিক আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।আখতারুজ্জামান শাকিলের খামার রয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে তাঁর প্লাস্টিক দানার ব্যবসা রয়েছে বলে জানা গেছে।নিজের বক্তব্যে শাকিল জানিয়েছেন, তিনি নিয়মিত মুঠোফোনে গেম খেলেন। তবে তাঁকে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ভয় দেখানো হয় বলে দাবি করেন তিনি।তাঁর অভিযোগ, পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে তাঁকে ও তাঁর বন্ধুকে তুলে নেওয়া হয়। পরে পুলিশ কার্যালয়ের একটি গোপনীয় শাখায় নিয়ে গিয়ে হয়। এরপর তাঁর বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট, ব্যাংক হিসাব, এটিএম এবং মোবাইল আর বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।
তাঁর দাবি, প্রথমে এক কোটি টাকা দাবি করা হলেও পরে দর-কষাকষির মাধ্যমে অর্থের পরিমাণ কমানো হয়। এরপর তাঁর বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট, ব্যাংক হিসাব, এটিএম এবং মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে টাকা নেওয়া হয়।
ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রবেশ ও বের হওয়ার রেকর্ড, ব্যাংক ও এটিএমের লেনদেনের তথ্য, বাইন্যান্স অ্যাকাউন্টের ট্রানজেকশন হিস্ট্রি, মোবাইল আর্থিক সেবার লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।বিশেষ করে ৪ সেপ্টেম্বর ব্যবসায়ী শাকিল ও তাঁর বন্ধু কীভাবে হালিশহরের কে-ব্লক এলাকা থেকে সিএমপি কার্যালয়ে গেলেন, তাঁদের সঙ্গে কারা ছিলেন এবং পরে কোথায় কোথায় নেওয়া হয়েছিল-এসব তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।একইভাবে শাকিলের অ্যাকাউন্ট থেকে যে ডলার ও টাকা স্থানান্তরের অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলোর গন্তব্য এবং লেনদেনের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে ছিল, সেটিও তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।একজন ব্যবসায়ী ও তাঁর বন্ধুকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ এবং পরে পুলিশের একটি গোপনীয় শাখায় নিয়ে গিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।বিশেষ করে অভিযোগে একজন সহকারী পুলিশ কমিশনারের নাম আসায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক কর্মকর্তার ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে বা দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কি না, নাকি ঘটনাটির পেছনে অন্য কোনো প্রেক্ষাপট রয়েছে-তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।ঘটনার পর তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখন তদন্তে অভিযোগের সত্যতা কতটা পাওয়া যায়, অর্থ ও ডলার লেনদেনের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন এবং ব্যবসায়ী ও তাঁর বন্ধুকে আটকের পেছনে পুলিশের বৈধ কোনো অভিযান ছিল কি না-এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।একই সঙ্গে যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিও নজরে থাকবে।আর যদি তদন্তে অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য বা ভিন্ন প্রেক্ষাপটের বলে প্রমাণিত হয়, সেটিও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।



