অনুসন্ধানঅপরাধ

রূপগঞ্জের এসিল্যান্ডকে বৃদ্ধাগুলী দেখিয়ে নায়েবের নের্তৃত্বে তারাব পৌর ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য আর অনিয়মের অভিযোগ

এম শাহীন আলম: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌর ভূমি অফিসে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি, দালালনির্ভর সেবা, সরকারি নথি সংরক্ষণে অনিয়ম এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে দ্রুত সেবা মিললেও সরাসরি অফিসে গিয়ে আবেদন করলে নানা অজুহাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তারাব পৌর ভূমি অফিসের নায়েব সাদ্দাম হোসেন। স্থানীয়দের দাবি, তিনি যোগদানের পর অফিসটিতে একটি দালালচক্রের তৎপরতা বেড়েছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার বা ব্যাখ্যা করার সুযোগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রয়েছে।

অফিসে বহিরাগতদের আনাগোনা –

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকারি নথি অনুযায়ী তারাব পৌর ভূমি অফিসে নির্ধারিত কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি একাধিক বহিরাগত ব্যক্তি বিভিন্ন কক্ষে চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, নায়েব সাদ্দাম হোসেনের কক্ষে একজন কম্পিউটার অপারেটরের পাশাপাশি একজন বহিরাগত ব্যক্তিকে নিয়মিত অবস্থান করতে দেখা যায়। পাশের সহকারী নায়েবের কক্ষেও একজন বহিরাগতকে চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করতে দেখা গেছে।

অফিসের প্রবেশমুখে দুটি টেবিলে আরও কয়েকজন বহিরাগতকে বসে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে দেখা যায়। ভবনের সিঁড়িতেও কয়েকজনের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়।

এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি ভূমি অফিসের অভ্যন্তরে বহিরাগত ব্যক্তিরা কীভাবে নিয়মিত বসে কাজ করছেন এবং তারা কোন কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন?

রেকর্ড রুম নিয়েও প্রশ্ন –

অনুসন্ধানের সময় ভূমি অফিসের রেকর্ড রুমের ভেতরেও বহিরাগত ব্যক্তির উপস্থিতি দেখা যায়। একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে সেখানে চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করতে দেখা গেছে। এছাড়া আরও কয়েকজনকে রেকর্ড রুম থেকে ফাইলপত্র নিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়।

সরকারি ভূমি রেকর্ড ও গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণের জায়গায় অনুমোদিত কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া অন্য ব্যক্তিদের এমন উপস্থিতি থাকলে নথির নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে এসব বহিরাগত ব্যক্তি কোনো অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় কাজ করছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দালাল ছাড়া সেবা মেলে না-

সরেজমিনে ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ না করলে অনেক কাজেই দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়তে হয়।

তাদের অভিযোগ, খাজনা পরিশোধ, নামজারি বা খারিজ, জমি সংক্রান্ত বিভিন্ন আবেদনসহ নানা সেবার ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিলে দ্রুত কাজ হয়—এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন সেবাপ্রার্থী।

তবে এসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এবং কার কাছে কী পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়েছে, তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

নামজারি নিয়ে অভিযোগ –

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, জমির নামজারি বা খারিজের আবেদন করার পর দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ না করলে সার্ভে তদন্ত ও প্রতিবেদন পেতে নানা ধরনের জটিলতার মুখে পড়তে হয়।

তাদের দাবি, বিভিন্ন অজুহাতে আবেদনকারীদের একাধিকবার অফিসে আসতে বলা হয়। অন্যদিকে দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে একই ধরনের কাজ তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে একটি সাধারণ খারিজের জন্য সর্বনিম্ন ৮ হাজার টাকা থেকে শুরু করে জমির ধরন ও জটিলতার ওপর ভিত্তি করে আরও বেশি অর্থ নেওয়া হয়।

এমনকি কাগজপত্রে ত্রুটি বা সমস্যা থাকলেও অর্থের বিনিময়ে তা ‘ম্যানেজ’ করে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন সেবাপ্রার্থী।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট আবেদন, রসিদ, নামজারি নথি ও অর্থ লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন।

এসিল্যান্ডকে অভিযোগ জানানো হয়-

সরেজমিন অনুসন্ধানের সময় অফিসে অবস্থানরত কথিত কয়েকজন দালালের ছবি এবং অফিসের অনিয়ম সংক্রান্ত বিষয়গুলো রূপগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ মারজানুর রহমানকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে অবহিত করা হয়।

জবাবে তিনি জানান, বিষয়টি তাকে জানানোর জন্য তিনি ধন্যবাদ জানান এবং তারাব পৌর ভূমি অফিসের দালালচক্র ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।

পরবর্তীতে তিনি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার মাধ্যমে তারাব পৌর ভূমি অফিস থেকে দালালদের বের করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান।

তবে অনুসন্ধানের সময় গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অফিস এলাকায় বহিরাগত ও কথিত দালালদের আনাগোনা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সরেজমিনে কিছু ব্যক্তিকে আগের মতোই অফিস এলাকায় অবস্থান করতে দেখা গেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

নায়েব সাদ্দামের বক্তব্য কী?

অভিযোগগুলোর বিষয়ে তারাব পৌর ভূমি অফিসের নায়েব সাদ্দাম হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে অফিসের অনিয়ম ও দালালদের বিষয়ে অভিযোগ জানিয়ে বার্তা পাঠানো হলে তিনি অভিযোগের প্রমাণ দেখতে চান।

তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দেননি।

অনুসন্ধানের জেরে হুমকির অভিযোগ –

এদিকে ভূমি অফিসে অনুসন্ধানের সময় কথিত দালালদের কয়েকটি ছবি নায়েব ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে পাঠানোর পর শাহাদাত নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে হোয়াটসঅ্যাপ কলে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রথমে জানতে চান, কেন তারাব পৌর ভূমি অফিসে যাওয়া হয়েছে এবং কেন সেখানে অবস্থানরত ব্যক্তিদের ছবি নায়েব ও এসিল্যান্ডকে পাঠানো হয়েছে।

একপর্যায়ে তিনি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং ভবিষ্যতে তারাব ভূমি অফিসের আশপাশে দেখা গেলে হাত-পা ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে ওই ব্যক্তির সাংবাদিক পরিচয় ও হুমকির অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন। এ ঘটনায় কোনো লিখিত অভিযোগ বা আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রশ্নের মুখে ভূমি অফিসের সেবা ব্যবস্থাপনা-

তারাব পৌর ভূমি অফিসে বহিরাগতদের অবস্থান, রেকর্ড রুমে তাদের প্রবেশ, দালালনির্ভর সেবা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সামনে আসায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সরকারি অফিসে বহিরাগতরা নিয়মিত বসে কাজ করার অনুমতি পাচ্ছেন কীভাবে? রেকর্ড রুমে অনুমোদন ছাড়া কারও প্রবেশের সুযোগ রয়েছে কি না? সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে সরকারি ফির বাইরে কোনো অর্থ নেওয়া হচ্ছে কি না? আর অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।

বিশেষ করে ভূমি-সংক্রান্ত সেবা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নির্ধারিত সরকারি ফি অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

অনুসন্ধান অব্যাহত –

তারাব পৌর ভূমি অফিসে দালালচক্রের তৎপরতা, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি, বহিরাগতদের অফিসে অবস্থান, রেকর্ড রুমে তাদের প্রবেশ এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, নামজারি ও খারিজের আবেদন, সরকারি ফি ও রসিদ, সেবা গ্রহণকারীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে নতুন তথ্য, নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রতিবেদনে তা তুলে ধরা হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button