তারেক রহমানের পাঁচ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা— অধ্যাপক এম এ বার্ণিক
অপরাধ বিচিত্রা ডেস্ক: বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তারেক রহমান সরকারের সামনে পাঁচটি আন্তঃসম্পর্কিত ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন। এসব মোকাবিলায় প্রয়োজন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি একটি সমন্বিত জাতীয় পুনর্গঠন কৌশল।
১. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা
প্রথম শর্ত হলো প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা। সরকার ও বিরোধী দল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হবে, রাষ্ট্রীয় শত্রু নয়।
এ জন্য—
ক. বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ ও সাংবিধানিক কর্মকাণ্ডের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
খ. রাজনৈতিক মামলা হয়রানি বা প্রতিশোধের হাতিয়ার না করে আইনি প্রক্রিয়ায় পরিচালনা করতে হবে।
গ. স্থানীয় সংঘাত ও আধিপত্য বন্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঘ. রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে স্পষ্ট “zero tolerance” নীতি ঘোষণা করতে হবে।
ঙ. জাতীয় বিষয়ে বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও তরুণদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ করতে হবে।
মূলনীতি:
«“ক্ষমতা দিয়ে প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ নয়; আস্থা দিয়ে রাজনৈতিক পরিবেশকে স্থিতিশীল করা।”»
২. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে দলীয় আনুগত্যের বাইরে আনতে হবে।
এ জন্য—
ক. নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
খ. বদলি ও পদায়নে আনুগত্যের বদলে দক্ষতা, সততা ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
গ. পুলিশকে রাজনৈতিক বাহিনী নয়, পেশাদার আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
ঘ. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
ঙ. সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, অডিট ও সরকারি ব্যয়ের ওপর নজরদারি কার্যকর করতে হবে।
এমন প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে, যা আজ বিএনপিকে সুবিধা দিলেও আগামীকাল তার বিরুদ্ধেও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে। এটাই প্রকৃত রাষ্ট্রীয় সংস্কার।
৩. অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও বৈষম্য হ্রাস
সরকারের সাফল্য জনগণ সবচেয়ে বেশি বিচার করবে অর্থনৈতিক ফলাফলে। তাই প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে একটি National Economic Recovery Roadmap ঘোষণা করা প্রয়োজন।
এর প্রধান দিকগুলো হলো—
ক. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সিন্ডিকেট দমন এবং মধ্যস্বত্বভোগী কমানো।
খ. ব্যাংকিং খাত সংস্কার: খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল পরিচালনা ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ ব্যবস্থা।
গ. কর্মসংস্থান: শিল্প, প্রযুক্তি, AI, সফটওয়্যার, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, কৃষি-প্রযুক্তি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সুযোগ সৃষ্টি।
ঘ. বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ: ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, দ্রুত অনুমোদন, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন।
ঙ. রাজস্ব সংস্কার: কর প্রশাসন ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করে করের আওতা বাড়ানো।
অর্থনীতির মূলনীতি:
«“Tax the economy less, grow the economy more—but eliminate leakage.”»
অর্থাৎ উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, পাশাপাশি অপচয় ও অর্থপাচার বন্ধ করতে হবে।
৪. জাতীয় স্বার্থভিত্তিক বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি
“Bangladesh First”–কে স্লোগান নয়, রাষ্ট্রীয় কূটনীতির কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে strategic multi-alignment অনুসরণ করা উচিত।
ভারতের ক্ষেত্রে
সম্পর্ক হবে সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে—সীমান্ত নিরাপত্তা, সীমান্ত হত্যা হ্রাস, পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে। ভারতকে শত্রু বানানো যেমন ক্ষতিকর, অতিনির্ভরতাও তেমনি পরিপন্থী।
চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য অংশীদার
চীনের অবকাঠামো, শিল্প ও বিনিয়োগ সক্ষমতা ব্যবহার করতে হবে স্বচ্ছতা ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে রপ্তানি, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও শ্রমবাজারে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। জাপান ও অন্যান্য অংশীদারের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মূলনীতি:
«“Friendship with all, dependency on none; national interest above geopolitical alignment.”»
৫. ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন
গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে স্মরণে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয় নীতি ও প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে।
এ জন্য—
ক. জুলাই চার্টার ও সাংবিধানিক সংস্কারের সময়সূচি ঘোষণা করতে হবে।
খ. প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ওপর কার্যকর checks and balances প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
গ. বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
ঘ. দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যকর ও স্বাধীন করতে হবে।
ঙ. রাষ্ট্রীয় নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা করতে হবে।
মূল শিক্ষা:
«“কোনো ব্যক্তি বা দল যেন ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের সমার্থক হয়ে উঠতে না পারে।”»
৬. একটি ‘১০০ দিনের জাতীয় স্থিতিশীলতা কর্মসূচি’
প্রথম ৩০ দিন
- রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঘোষণা;
- প্রশাসন ও পুলিশে পেশাদারিত্বের নির্দেশ;
- বাজার ও ব্যাংকিং খাতের জরুরি মূল্যায়ন;
- জাতীয় সংলাপ শুরু।
৩১–৬০ দিন
- প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের রোডম্যাপ;
- বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও তরুণদের কর্মসংস্থান কর্মসূচি;
- দুর্নীতি ও অর্থপাচার প্রতিরোধে বিশেষ ব্যবস্থা;
- পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার নির্ধারণ।
৬১–১০০ দিন
- নির্বাচনী ও সাংবিধানিক সংস্কারের অগ্রগতি প্রকাশ;
- ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারের প্রথম ধাপ;
- জাতীয় কর্মসংস্থান পরিকল্পনা;
- প্রশাসনিক সংস্কারের ফলাফল ও 100-Day Performance Report প্রকাশ।
এতে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব কাজের পার্থক্য স্পষ্ট হবে।
৭. তারেক রহমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দর্শন
তারেক রহমান চাইলে শুধু প্রধানমন্ত্রী নয়, প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র পুনর্গঠনের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। এর ভিত্তি হবে—
১. দল রাষ্ট্র নয়।
২. বিরোধী দল শত্রু নয়।
৩. প্রশাসন কোনো দলের সম্পত্তি নয়।
৪. বিচারব্যবস্থা প্রতিশোধের হাতিয়ার নয়।
৫. রাষ্ট্রীয় সম্পদ কোনো গোষ্ঠীর লুটের সম্পদ নয়।
এই নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে।
উপসংহার
তারেক রহমান সরকারের পাঁচটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মূল কৌশল হওয়া উচিত “ক্ষমতা সংরক্ষণ” নয়, “রাষ্ট্র পুনর্গঠন”।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে সহিষ্ণুতা থেকে; গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে দলীয় প্রভাবমুক্তির মাধ্যমে; অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হবে সুশাসন ও উৎপাদনশীলতায়; পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত ভারসাম্যে; আর ২০২৪ সালের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হবে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে।
সাফল্যের মাপকাঠি বিএনপি কত বছর ক্ষমতায় থাকল তা নয়; বরং তারা এমন রাষ্ট্রীয় কাঠামো রেখে যেতে পারল কি না, যেখানে কোনো দল, প্রধানমন্ত্রী বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যক্তিগত বা দলীয় ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত করতে না পারে।
«সেখানেই তারেক রহমানের নেতৃত্বের ঐতিহাসিক সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা নির্ধারিত হবে।»
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তারেক রহমান সরকারের সামনে পাঁচটি আন্তঃসম্পর্কিত ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন। এসব মোকাবিলায় প্রয়োজন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি একটি সমন্বিত জাতীয় পুনর্গঠন কৌশল।
১. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা
প্রথম শর্ত হলো প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা। সরকার ও বিরোধী দল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হবে, রাষ্ট্রীয় শত্রু নয়।
এ জন্য—
ক. বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ ও সাংবিধানিক কর্মকাণ্ডের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
খ. রাজনৈতিক মামলা হয়রানি বা প্রতিশোধের হাতিয়ার না করে আইনি প্রক্রিয়ায় পরিচালনা করতে হবে।
গ. স্থানীয় সংঘাত ও আধিপত্য বন্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঘ. রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে স্পষ্ট “zero tolerance” নীতি ঘোষণা করতে হবে।
ঙ. জাতীয় বিষয়ে বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও তরুণদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ করতে হবে।
মূলনীতি:
«“ক্ষমতা দিয়ে প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ নয়; আস্থা দিয়ে রাজনৈতিক পরিবেশকে স্থিতিশীল করা।”»
২. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে দলীয় আনুগত্যের বাইরে আনতে হবে।
এ জন্য—
ক. নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
খ. বদলি ও পদায়নে আনুগত্যের বদলে দক্ষতা, সততা ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
গ. পুলিশকে রাজনৈতিক বাহিনী নয়, পেশাদার আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
ঘ. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
ঙ. সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, অডিট ও সরকারি ব্যয়ের ওপর নজরদারি কার্যকর করতে হবে।
এমন প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে, যা আজ বিএনপিকে সুবিধা দিলেও আগামীকাল তার বিরুদ্ধেও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে। এটাই প্রকৃত রাষ্ট্রীয় সংস্কার।
৩. অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও বৈষম্য হ্রাস
সরকারের সাফল্য জনগণ সবচেয়ে বেশি বিচার করবে অর্থনৈতিক ফলাফলে। তাই প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে একটি National Economic Recovery Roadmap ঘোষণা করা প্রয়োজন।
এর প্রধান দিকগুলো হলো—
ক. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সিন্ডিকেট দমন এবং মধ্যস্বত্বভোগী কমানো।
খ. ব্যাংকিং খাত সংস্কার: খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল পরিচালনা ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ ব্যবস্থা।
গ. কর্মসংস্থান: শিল্প, প্রযুক্তি, AI, সফটওয়্যার, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, কৃষি-প্রযুক্তি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সুযোগ সৃষ্টি।
ঘ. বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ: ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, দ্রুত অনুমোদন, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন।
ঙ. রাজস্ব সংস্কার: কর প্রশাসন ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করে করের আওতা বাড়ানো।
অর্থনীতির মূলনীতি:
«“Tax the economy less, grow the economy more—but eliminate leakage.”»
অর্থাৎ উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, পাশাপাশি অপচয় ও অর্থপাচার বন্ধ করতে হবে।
৪. জাতীয় স্বার্থভিত্তিক বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি
“Bangladesh First”–কে স্লোগান নয়, রাষ্ট্রীয় কূটনীতির কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে strategic multi-alignment অনুসরণ করা উচিত।
ভারতের ক্ষেত্রে
সম্পর্ক হবে সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে—সীমান্ত নিরাপত্তা, সীমান্ত হত্যা হ্রাস, পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে। ভারতকে শত্রু বানানো যেমন ক্ষতিকর, অতিনির্ভরতাও তেমনি পরিপন্থী।
চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য অংশীদার
চীনের অবকাঠামো, শিল্প ও বিনিয়োগ সক্ষমতা ব্যবহার করতে হবে স্বচ্ছতা ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে রপ্তানি, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও শ্রমবাজারে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। জাপান ও অন্যান্য অংশীদারের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মূলনীতি:
«“Friendship with all, dependency on none; national interest above geopolitical alignment.”»
৫. ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন
গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে স্মরণে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয় নীতি ও প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে।
এ জন্য—
ক. জুলাই চার্টার ও সাংবিধানিক সংস্কারের সময়সূচি ঘোষণা করতে হবে।
খ. প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ওপর কার্যকর checks and balances প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
গ. বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
ঘ. দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যকর ও স্বাধীন করতে হবে।
ঙ. রাষ্ট্রীয় নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা করতে হবে।
মূল শিক্ষা:
«“কোনো ব্যক্তি বা দল যেন ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের সমার্থক হয়ে উঠতে না পারে।”»
৬. একটি ‘১০০ দিনের জাতীয় স্থিতিশীলতা কর্মসূচি’
প্রথম ৩০ দিন
- রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঘোষণা;
- প্রশাসন ও পুলিশে পেশাদারিত্বের নির্দেশ;
- বাজার ও ব্যাংকিং খাতের জরুরি মূল্যায়ন;
- জাতীয় সংলাপ শুরু।
৩১–৬০ দিন
- প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের রোডম্যাপ;
- বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও তরুণদের কর্মসংস্থান কর্মসূচি;
- দুর্নীতি ও অর্থপাচার প্রতিরোধে বিশেষ ব্যবস্থা;
- পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার নির্ধারণ।
৬১–১০০ দিন
- নির্বাচনী ও সাংবিধানিক সংস্কারের অগ্রগতি প্রকাশ;
- ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারের প্রথম ধাপ;
- জাতীয় কর্মসংস্থান পরিকল্পনা;
- প্রশাসনিক সংস্কারের ফলাফল ও 100-Day Performance Report প্রকাশ।
এতে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব কাজের পার্থক্য স্পষ্ট হবে।
৭. তারেক রহমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দর্শন
তারেক রহমান চাইলে শুধু প্রধানমন্ত্রী নয়, প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র পুনর্গঠনের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। এর ভিত্তি হবে—
১. দল রাষ্ট্র নয়।
২. বিরোধী দল শত্রু নয়।
৩. প্রশাসন কোনো দলের সম্পত্তি নয়।
৪. বিচারব্যবস্থা প্রতিশোধের হাতিয়ার নয়।
৫. রাষ্ট্রীয় সম্পদ কোনো গোষ্ঠীর লুটের সম্পদ নয়।
এই নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে।
লক্ষ্য রাষ্ট্র নুনর
তারেক রহমান সরকারের পাঁচটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মূল কৌশল হওয়া উচিত “ক্ষমতা সংরক্ষণ” নয়, “রাষ্ট্র পুনর্গঠন”।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে সহিষ্ণুতা থেকে; গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে দলী প্রভাবমুক্তির মাধ্যমে; অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হবে সুশাসন ও উৎপাদনশীলতায়; পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত ভারসাম্যে; আর ২০২৪ সালের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হবে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে।
সাফল্যের মাপকাঠি বিএনপি কত বছর ক্ষমতায় থাকল তা নয়; বরং তারা এমন রাষ্ট্রীয় কাঠামো রেখে যেতে পারল কি না, যেখানে কোনো দল, প্রধানমন্ত্রী বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যক্তিগত বা দলীয় ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত করতে না পারে।
«সেখানেই তারেক রহমানের নেতৃত্বের ঐতিহাসিক সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা নির্ধারিত হবে। [ লেখক অধ্যাপক এম এ বার্ণিক একজন উচ্চমার্গের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক ঘটনা পর্যবক্ষক ]



