চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে মাদক হস্তান্তরের আগেই পুলিশের অভিযান, হেরোইনসহ গ্রেপ্তার ২ জন কথিত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম নগরের আকবর শাহ এলাকায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী একটি বাসে অভিযান চালিয়ে ১০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের দাবি করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ ঘটনায় দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া মামলায় আরও একজনকে পলাতক আসামি করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে মাথাগুলো ঢাকা থেকে সংগ্রহ করে চট্টগ্রামে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনার তথ্য পাওয়া গেছে।ঘটনাটি ঘটে গত ৫ অক্টোবর রাত সোয়া ১০টার দিকে। পরদিন ৬ অক্টোবর রাত ১টা ১০ মিনিটে খুলশী থানায় এ ঘটনায় মামলা করা হয়। মামলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১) ধারার সারণির ৮(গ) ও ৪১ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।মামলার এজাহার অনুযায়ী, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের একটি দল ৫ অক্টোবর সকাল থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের দায়িত্বে ছিল। সন্ধ্যার দিকে আকবর শাহ থানাধীন সিটি গেট এলাকায় অবস্থানকালে পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে, ঢাকাগামী একটি বাসে একজন যাত্রী হেরোইন নিয়ে চট্টগ্রামের দিকে আসছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হলে সংবাদটির সত্যতা যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।এরপর গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা আকবর শাহ থানাধীন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিএসআরএম কারখানা এলাকার কাছে অবস্থান নেন। রাত আনুমানিক ৮টা ৫০ মিনিটে ‘সেঁজুতি ট্রাভেলস’ নামের একটি বাস সেখানে পৌঁছালে পুলিশ বাসটিকে থামার সংকেত দেয়। বাসের গতি কমলে গোয়েন্দা পুলিশের কয়েকজন সদস্য বাসে ওঠেন এবং সন্দেহভাজন যাত্রীদের ওপর নজরদারি শুরু করেন। অন্য সদস্যরা মোটরসাইকেল ও সরকারি মাইক্রোবাস নিয়ে বাসটির সামনে-পেছনে অবস্থান নেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।এজাহারে বলা হয়েছে, পুলিশের নজরদারিতে এক যাত্রীর গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে তাকে কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি তাঁর কাছে হেরোইন থাকার কথা স্বীকার করেন বলে পুলিশের দাবি। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি আরও জানান, ঢাকার টিটিপাড়া এলাকা থেকে ‘রনি’ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে কম দামে হেরোইন কিনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে তা নিয়ে আসছিলেন।পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই যাত্রী মাদকটি অন্য একজনের কাছে জমা রাখার জন্য মোবাইল ফোনে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। পরে দ্বিতীয় একজনকে মাদকটি গ্রহণের জন্য পাঠানো হচ্ছে বলে তাকে জানানো হয়।এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, রাত আনুমানিক ৯টা ৩৫ মিনিটে বাসটি আকবর শাহ থানাধীন ডি টি রোডের কর্নেলহাট উত্তর কাট্টলী এলাকার একটি ফুটওভার ব্রিজের কাছে পৌঁছালে একজন ব্যক্তি বাসটির পূর্ব পাশে এসে দাঁড়ান। বাসের ভেতরে থাকা প্রথম আসামি ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে দেন বলে পুলিশের দাবি। এরপর গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা দ্বিতীয় ব্যক্তিকে আটক করেন।মামলায় গ্রেপ্তার দুজন হলেন শাহেদুল ইসলাম আনান ও মোঃ ইপু সুলতান অপি। এ ছাড়া বেলাল আলী খান নামের আরেক ব্যক্তিকে পলাতক আসামি করা হয়েছে।পুলিশের এজাহারে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে দুজন তাঁদের পরিচয় ও ঠিকানা জানান। তাঁরা আরও জানান, তৃতীয় আসামি খুলশী থানাধীন আমবাগান এলাকার শাহাজাহান মাঠের আশপাশে অবস্থান করছেন। পরে পুলিশ সেখানে অভিযান চালালেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।এরপর গোয়েন্দা পুলিশের দল আমবাগান এলাকার শাহাজাহান মাঠের সামনে আমবাগান থেকে টাইগারপাসগামী সড়কে যায়। সেখানে তৃতীয় আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হলেও তিনি পালিয়ে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।পুলিশের দাবি, পরে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে গ্রেপ্তার শাহেদুল ইসলাম আনানের পরিহিত সাদা কার্গো প্যান্টের ডান পকেট থেকে একটি ছোট লাল রঙের শপিং ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। ওই ব্যাগের ভেতরে নীল পলিথিনে মোড়ানো একটি সাদা প্লাস্টিকের প্যাকেট ছিল। প্যাকেটের ভেতর কথিত হেরোইন পাওয়া যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল নিক্তিতে পলিথিনসহ ওই মাদকের ওজন ১০০ গ্রাম পাওয়া যায়। এ ছাড়া ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ‘সেঁজুতি ট্রাভেলস’ বাসের একটি টিকিট এবং মাদক কেনাবেচায় ব্যবহারের অভিযোগে দুটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।মামলার নথিতে আরও বলা হয়েছে, জব্দ করা আলামতের মধ্যে একটি সাদা রঙের মোবাইল ফোন ছিল, যা প্রথম আসামি ব্যবহার করতেন বলে পুলিশ দাবি করেছে। অন্য একটি মোবাইল ফোন দ্বিতীয় আসামির ব্যবহৃত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জব্দের সময় বাসের পর্যাপ্ত আলো ছিল এবং রাত আনুমানিক ১০টা ১৫ মিনিটে জব্দ তালিকা প্রস্তুত করা হয় বলে এজাহারে বলা হয়েছে। জব্দ তালিকায় সাক্ষীদের স্বাক্ষর নেওয়ার পাশাপাশি বাদী ও আসামিদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ আছে।পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় আসামির সঙ্গে যোগসাজশে ঢাকা থেকে কম দামে হেরোইন সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় বেশি দামে বিক্রি করে আসছিলেন।মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মামলার নথি অনুযায়ী, জব্দ করা মাদক ও অন্যান্য আলামত এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।এদিকে, মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিতে ঘটনার স্থান হিসেবে খুলশী থানাধীন আমবাগান এলাকার শাহাজাহান মাঠের সামনের সড়কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। থানার নথিতে ঘটনাস্থলটি খুলশী থানার একটি নির্দিষ্ট বিট এলাকার অন্তর্ভুক্ত বলে উল্লেখ রয়েছে।মামলার এজাহারে পুলিশের অভিযান, মাদক উদ্ধার এবং আসামিদের পারস্পরিক যোগাযোগের বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তবে এজাহারে থাকা অভিযোগের পাশাপাশি আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণ, জব্দ করা আলামতের ফরেনসিক ও রাসায়নিক পরীক্ষার ফল এবং সাক্ষীদের বক্তব্য তদন্তের পর মামলার প্রকৃত ঘটনা আরও স্পষ্ট হবে।এদিকে, মামলার বাইরে স্থানীয় পর্যায়ে আব্দুর রহিম নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগের কথাও বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিজেকে ১০ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে পাহাড়তলী বিসিক শিল্পনগরী এলাকার সী মার্ক ফ্যাক্টরি রোডে বিভিন্ন যানবাহন থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করেন বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। অপরাধীরা নিজেই স্বীকার করলেন তারা বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের রাজনীতির সাথে জড়িত। সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য ও তদন্তের ফল পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।মাদক উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বর্তমানে গ্রেপ্তার দুই আসামি এবং পলাতক এক আসামিকে ঘিরে তদন্ত চলছে। তদন্তে মাদকের উৎস, পরিবহন, সম্ভাব্য ক্রেতা-বিক্রেতা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button