ইসলাম ধর্মধর্ম ও জীবন

জীবনে কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইস্তিখারার গুরুত্ব ও সঠিক নিয়ম

ধর্ম ও জীবন ডেস্ক: মানুষের পার্থিব জীবনে প্রতিনিয়ত নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। চাকরি পরিবর্তন, নতুন ব্যবসা শুরু করা, জীবনসঙ্গী নির্বাচন, কিংবা কোনো দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ গ্রহণের মতো বিষয়গুলোতে প্রায়ই মানুষ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে থাকে। একদিকে নিজের মন ও ভাবনা একমুখী টানে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও পরিণতির চিন্তা মনে ভীতি তৈরি করে। এমন পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের জন্য মহান আল্লাহর শরণাপন্ন হয়ে সঠিক পথ ও কল্যাণ কামনা করার সবচেয়ে সুন্দর মাধ্যম হলো ‘ইস্তিখারা’।

আরবি শব্দ ‘ইস্তিখারা’-র শাব্দিক অর্থ হলো কল্যাণ কামনা করা বা কোনো বিষয়ে উত্তম কিছু প্রার্থনা করা। ইসলামি পরিভাষায়, নিজের সীমিত জ্ঞান ও চেষ্টার পাশাপাশি কোনো বৈধ বা হালাল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আল্লাহর দরবারে উত্তম বিষয়টি নির্ধারণ করে দেওয়ার জন্য আকুল আবেদন জানানোই ইস্তিখারা।

আমরা অনেক সময় বাহ্যিক দৃষ্টিতে কোনো চাকরি বা ব্যবসাকে নিজের জন্য অত্যন্ত লাভজনক মনে করি, যা পরবর্তীতে কষ্টের কারণ হতে পারে। আবার আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হওয়া কোনো সুযোগ জীবনে অপ্রত্যাশিত কল্যাণ নিয়ে আসতে পারে। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত হলেও মহান আল্লাহ সর্বজ্ঞ। তাই ইস্তিখারার মাধ্যমে বান্দা নিজের অপারগতা ও আল্লাহর অসীম জ্ঞানের ওপর পূর্ণ আস্থা ও সমর্পণ প্রকাশ করে।

বিয়ে, চাকরি, ব্যবসা, পড়াশোনা, আবাসন পরিবর্তন কিংবা জীবনের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ হালাল বা বৈধ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ইস্তিখারা করা সুন্নাহসম্মত। তবে মনে রাখতে হবে, ইসলামে যে বিষয়গুলো ফরজ বা ওয়াজিব (যেমন দৈনিক সালাত আদায় করা) কিংবা যা সম্পূর্ণরূপে হারাম (যেমন সুদ বা অনৈতিক কাজ), সেগুলোতে ইস্তিখারার কোনো অবকাশ নেই। ইস্তিখারা কেবল তখনই করা হয়, যখন একাধিক বৈধ বা হালাল বিকল্পের মধ্যে কোনটি নিজের জন্য শ্রেয় হবে তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি হয়।

হাদিসে বর্ণিত সঠিক নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমে ভালোভাবে অজু করে দুই রাকাত নফল সালাত (ইস্তিখারার সালাত) আদায় করতে হবে। সালাত শেষ করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো নির্দিষ্ট ইস্তিখারার দোয়াটি পড়তে হবে। এই দোয়ায় আল্লাহ তাআলার কাছে নিজের দ্বীন, দুনিয়া ও পরিণামের জন্য যা কল্যাণকর, তা সহজ করে দেওয়া এবং অকল্যাণকর বিষয় দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রার্থনা করা হয়। দোয়াটি অর্থ বুঝে আরবিতে পাঠ করা সর্বোত্তম।

সমাজে ইস্তিখারা নিয়ে কিছু ভিত্তিহীন ধারণা প্রচলিত রয়েছে। যেমন—অনেকে মনে করেন ইস্তিখারার পর অবশ্যই কোনো স্বপ্ন দেখতে হবে এবং স্বপ্নে সাদা বা লাল-নীল রঙের নির্দিষ্ট সংকেত খুঁজতে যান। অথচ সহিহ হাদিসে ইস্তিখারার পর স্বপ্ন দেখা বাধ্যতামূলক বলে কোনো শর্ত নেই। স্বপ্ন না দেখলেও ইস্তিখারা সম্পূর্ণ হয়।

ইস্তিখারা কোনো ‘জাদুকরি সংকেত’ পাওয়ার মাধ্যম নয়; এটি মূলত আল্লাহর কাছে নিজের সিদ্ধান্তকে সঁপে দিয়ে তাঁর ওপর ভরসা করার একটি ইবাদত। ইস্তিখারার পর বাস্তব পরিস্থিতি, তথ্য-উপাত্ত যাচাই, অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শ এবং নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা কাজে লাগিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

ইসলাম আমাদের কেবল দোয়া করতে শেখায়নি, বরং সঠিক পন্থায় চেষ্টা ও প্রস্তুতি নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে। ব্যবসা করতে চাইলে তার পরিকল্পনা করা, চাকরির জন্য দক্ষতা অর্জন করা কিংবা বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর দ্বীনদারি ও চরিত্র যাচাই করার পর আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে। হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকে অলৌকিক ইশারার অপেক্ষার নাম তাওয়াক্কুল নয়। সর্বোচ্চ চেষ্টা ও ইস্তিখারার পর যে সিদ্ধান্ত যুক্তিসংগত মনে হবে, সেটাই গ্রহণ করতে হবে এবং ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে।

জীবনের প্রতিটি বাঁকে আমাদের চাওয়া থাকে শান্তি, বরকত ও সঠিক দিকনির্দেশনা। নিজের সীমিত বুদ্ধির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে, আসুন যেকোনো হালাল ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সুন্নাহসম্মত উপায়ে ইস্তিখারা করার সুন্দর অভ্যাসটি গড়ে তুলি। আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেককে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button