আইন-শৃঙ্খলা

চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী কিশোর গ্যাং লিডার বগা জেল হাজতে

দুলাল শিকদার: চাঁদাবাজি, মাদক, জমি দখল ও বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১৭ মামলার আসামি বলে পুলিশের দাবি | গ্রেপ্তার অভিযানে পুলিশের ওপর হামলা, গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পালানোর অভিযোগ

চট্টগ্রাম নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন। চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, জমি দখল, বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলায় অভিযুক্ত এই নেতাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রোববার (১৮ অক্টোবর) চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহিদুল ইসলামের আদালতে আত্মসমর্পণের পর শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। খুলশী থানার একটি মামলায় আত্মসমর্পণ করেন তিনি। মামলাটির নম্বর ০৮(১০)২৬। এতে দণ্ডবিধির ৩০৭ ও ৩৮৫ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আত্মসমর্পণের পর শুনানি শেষে বগাকে সিডব্লিউ মূলে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম আদালতের একজন সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে, ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন। শুনানি শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম নগরের খুলশী, পাহাড়তলী ও আকবর শাহ এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আলোচনায় ছিলেন বগা। পুলিশের দাবি, তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক, জমি দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১৭টি মামলা রয়েছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে একাধিকবার তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগে গত ৮ জুন তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় পদ হারানোর পরও বিভিন্ন অভিযোগে তার নাম আলোচনায় আসতে থাকে।

খুলশী, পাহাড়তলী ও আকবর শাহ এলাকায় প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং জমি দখলসংক্রান্ত অভিযোগের কারণে তাকে নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা রয়েছে বলে বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব মামলার সব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে এই বগা এমন কোন অপরাধ নেই যে তা করেননি

বগাকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে গত ৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের খুলশীর ওয়্যারলেস মোড় ও পাহাড়তলী এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। ওই অভিযানকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।

পুলিশের অভিযোগ, অভিযানের সময় বগার অনুসারীরা ইটপাটকেল ও ককটেলসদৃশ বস্তু নিক্ষেপ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা চালান। এতে খুলশী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। এ সময় পুলিশের একটি গাড়িও ভাঙচুর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঘটনার পর বগা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। একই সঙ্গে তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করে পুলিশ। ওই ঘটনার পর থেকেই বগার অবস্থান এবং তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা নিয়ে নগরজুড়ে আলোচনা শুরু হয়।

৪ সেপ্টেম্বরের অভিযানের পর বগার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে একটি গোপন সুড়ঙ্গের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ওই সুড়ঙ্গ ব্যবহার করেই পুলিশের অভিযান চলাকালে পালিয়ে যান বগা।

তবে সুড়ঙ্গটির প্রকৃত ব্যবহার, সেটি কীভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই অভিযানের পর বগা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো তদন্তের আওতায় আসে।

এ ঘটনার পর তাকে গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত ছিল। অবশেষে ১৮ অক্টোবর আদালতে আত্মসমর্পণের পর তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হলো।

এর আগে গত ২৯ আগস্ট পাহাড়তলী কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মিজানুর রহমান চৌধুরীকে তুলে নিয়ে মারধর এবং কলেজের অধ্যক্ষকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে একটি মামলা করা হয়। ওই মামলায় বগাকে দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, শিক্ষককে মারধর এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানকে হুমকি দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলাটি দায়ের করা হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছিল পুলিশ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে মারধর ও অধ্যক্ষকে হুমকি দেওয়ার মতো অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ তৈরি করে। তবে মামলায় নাম থাকা মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়; এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনি এলাকায় সবজি বিক্রেতা কিশোর হৃদয় (১৬) হত্যাকাণ্ডের পরও আলোচনায় আসেন বগা। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সেভেন স্টার নামে একটি কিশোর গ্যাং পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তার এবং তার ছোট ভাই রকিবুল ইসলাম ওরফে পিচ্চির বিরুদ্ধে।

পুলিশের দাবি, হৃদয় হত্যাকাণ্ডের পেছনে দুটি কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, আধিপত্য বিস্তার এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি এ ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসে।

নগরীর আবাসিক এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং অপরাধে কিশোরদের ব্যবহার নিয়ে অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধের পথে ঠেলে দেওয়ার পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বগাকে ঘিরে আলোচনার মধ্যে গত ৬ অক্টোবর রাতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নগর ভবনেও তাকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে পুলিশ অভিযান চালায় বলে জানা গেছে। ওই অভিযানকে কেন্দ্র করে মেয়র শাহাদাত হোসেনের হস্তক্ষেপে পুলিশের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে।

তবে মেয়র শাহাদাত হোসেন এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, বগা সেদিন নগর ভবনে যাননি। ফলে ঘটনাটি নিয়ে পুলিশের অভিযান এবং মেয়রের বক্তব্যের মধ্যে ভিন্নতা দেখা দেয়।

নগর ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় অভিযানকে কেন্দ্র করে এমন অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে। তবে এ ঘটনায় ঠিক কী ঘটেছিল, অভিযান কোন পরিস্থিতিতে ব্যাহত হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল-তা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তদন্ত-তথ্য প্রয়োজন।

চাঁদাবাজি, মাদক, জমি দখল, বিস্ফোরক, শিক্ষককে মারধর এবং পুলিশের অভিযানের সময় হামলার অভিযোগ-বিভিন্ন ঘটনায় ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগার নাম উঠে এসেছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৭টি মামলা রয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে কয়েকটি গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

রোববার খুলশী থানার একটি মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণের পর তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্ত, আদালতের কার্যক্রম এবং অভিযোগগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চট্টগ্রাম নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন নগরবাসী। বগার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় কী অগ্রগতি হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button