চট্টগ্রামে মাদক বিক্রয় বাধা যুবদল নেতা আনোয়ারকে হত্যা করতে মরিয়া মাদক কারবারিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়তলী এলাকায় মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করায় প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ মো. আনোয়ার হোসেন। তাঁর অভিযোগ, এলাকায় মাদকের বিস্তার রোধে প্রচার-প্রচারণা চালানোর কারণে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে-এমন কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে বিভিন্নভাবে বাধা দিচ্ছেন এবং ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। সর্বশেষ গত ১৫ অক্টোবর ২০২৬ রাতে পাহাড়তলীর নোয়াপাড়া রেলওয়ে কলোনী এলাকায় মাদকবিরোধী জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার সময় কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর পথরোধ করে কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় বলে তাঁর দাবি।
এ ঘটনায় নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পরদিন ১৬ অক্টোবর পাহাড়তলী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন আনোয়ার হোসেন। তাঁর জিডি নম্বর ৮৭৬ এবং ট্র্যাকিং নম্বর IAL1FC। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়ে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
আনোয়ার হোসেনের দাবি, পাহাড়তলী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদকবিরোধী সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন তিনি। যুবসমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে মাদকবিরোধী সচেতনতা বাড়ানোই তাঁর কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য। তবে এই উদ্যোগের কারণে তাঁকে বিরোধিতা, হুমকি ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর। অতীতেও তাঁর ওপর প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছেন তিনি। এ-সংক্রান্ত একটি মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলেও লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছেন।
পাহাড়তলী থানায় দাখিল করা সাধারণ ডায়েরির বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর ২০২৬ রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে নোয়াপাড়া রেলওয়ে কলোনী এলাকায় মাদকবিরোধী জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন আনোয়ার হোসেন। এ সময় মো. আলমগীর ও মোহাম্মদ রেজাউল করিম নামে দুজন এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি তাঁর পথরোধ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আনোয়ার হোসেনের অভিযোগ, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাঁকে মাদকবিরোধী প্রচার-প্রচারণা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম বন্ধ করতে বলেন। তিনি তাঁদের কথায় রাজি না হলে তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর থেকে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বলে জিডিতে উল্লেখ করেছেন তিনি।
জিডিতে অভিযুক্ত হিসেবে মো. আলমগীর (৪২) ও মোহাম্মদ রেজাউল করিমের (৩৬) নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের ঠিকানা হিসেবে পাহাড়তলীর নোয়াপাড়া, সিডিএ মার্কেটসংলগ্ন রসুল আহাম্মদ কলোনী এবং নোয়াপাড়া রেলওয়ে কলোনীর কথা উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনার সময় এ ধরনের বাধা ও হুমকি তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তিনি আশঙ্কা করছেন, কার্যক্রম বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে তাঁর ওপর আরও বড় ধরনের হামলা হতে পারে।
পুলিশ কমিশনারের কাছে পাঠানো লিখিত অভিযোগে আনোয়ার হোসেন দাবি করেছেন, পাহাড়তলী এলাকায় মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে এর আগেও একাধিকবার বাধা ও হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। এমনকি অতীতে তাঁর ওপর প্রাণঘাতী হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন।
তিনি জানান, পূর্বের হামলার ঘটনায় পাহাড়তলী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন, যা বর্তমানে বিজ্ঞ আদালতে বিচারাধীন। তবে ওই মামলার নম্বর, আসামিদের পরিচয়, মামলার বর্তমান অবস্থা এবং অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাঁর দেওয়া লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি।
আনোয়ার হোসেনের অভিযোগ, অতীতের এসব ঘটনার পরও তিনি মাদকবিরোধী সামাজিক কার্যক্রম বন্ধ করেননি। বরং এলাকার তরুণ ও যুবসমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে জনসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন। কিন্তু সর্বশেষ ঘটনার পর তাঁর আশঙ্কা আরও বেড়েছে। লিখিত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, মাদকের বিস্তার রোধে সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করা কোনো ব্যক্তিকে যদি ভয়ভীতি ও সহিংসতার মুখে পড়তে হয়, তাহলে এলাকার অন্য বাসিন্দারাও মাদকবিরোধী কার্যক্রমে অংশ নিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এ কারণে নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি এলাকার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
গত ১৬ অক্টোবর পাহাড়তলী থানায় সাধারণ ডায়েরি করার পর আনোয়ার হোসেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর হোয়াটসঅ্যাপে একটি লিখিত অভিযোগ পাঠান। অভিযোগের শিরোনামে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের কারণে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি, সম্ভাব্য হত্যার আশঙ্কা, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানানো হয়েছে।
পুলিশ কমিশনারের কাছে পাঠানো আবেদনে আনোয়ার হোসেন নিজেকে পাহাড়তলী সিডিএ মার্কেটের একজন ব্যবসায়ী এবং পাহাড়তলী থানা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এবং চট্টগ্রাম বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবসায়ী গ্রুপের সদস্য বলেও উল্লেখ করেছেন।
লিখিত অভিযোগে তিনি জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বা কাউকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এলাকায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তিনি পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তিনি মনে করেন, তাঁর নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হলে সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
আনোয়ার হোসেন তাঁর লিখিত অভিযোগে পুলিশ কমিশনারের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। প্রথমত, পাহাড়তলী থানায় দায়ের করা জিডি নম্বর ৮৭৬-এর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা চেয়েছেন তিনি। দ্বিতীয়ত, তাঁর জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন। তৃতীয়ত, অতীতে তাঁর ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা বিচারাধীন মামলার আইনগত কার্যক্রম যথাযথভাবে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় তদারকি কামনা করেছেন।
চতুর্থত, পাহাড়তলী এলাকায় মাদক ব্যবসার বিষয়ে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
পঞ্চমত, পাহাড়তলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তাঁর নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ও আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
আনোয়ার হোসেনের দাবি, এসব পদক্ষেপ নেওয়া হলে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি এলাকায় মাদকবিরোধী সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার পরিবেশও উন্নত হবে।
মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদকদ্রব্যের বিস্তার নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে পাহাড়তলীর এই অভিযোগ নতুন করে নিরাপত্তা ও সামাজিক সচেতনতার প্রশ্ন সামনে এনেছে। মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোনো ব্যক্তি হুমকি বা বাধার অভিযোগ করলে তা যথাযথভাবে তদন্ত করা এবং অভিযোগের সত্যতা অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠলে বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে না দেখে ঘটনার প্রকৃতি, সম্ভাব্য ঝুঁকি, পূর্বের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা প্রতিষ্ঠা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আনোয়ার হোসেনের অভিযোগের ক্ষেত্রেও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য, সম্ভাব্য সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা যেতে পারে। পাশাপাশি তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে করা আবেদনের বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের পদক্ষেপ কী, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সচেতন ব্যক্তিরা।
আনোয়ার হোসেন তাঁর অভিযোগে বলেছেন, তিনি সমাজ থেকে মাদকের বিস্তার কমাতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সামাজিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে চান। কিন্তু এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার কারণে নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তাঁর প্রত্যাশা, পুলিশ প্রশাসন জিডির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করবে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে পাহাড়তলী এলাকায় মাদকসংক্রান্ত অভিযোগগুলোও আইনানুগভাবে খতিয়ে দেখা হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
এ বিষয়ে পাহাড়তলী থানা কিংবা সিএমপি কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে। একইভাবে অভিযোগে নাম উল্লেখ করা ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তাঁদের বক্তব্যও প্রকাশ করা হবে।
সব মিলিয়ে, পাহাড়তলীতে মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনাকে কেন্দ্র করে আনোয়ার হোসেনের প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ, থানায় সাধারণ ডায়েরি এবং পুলিশ কমিশনারের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন-ঘটনাটি এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে।



