মানুষের জীবন ও নেয়ামত ধ্বংসকারী তিনটি মারাত্মক শব্দ
ইসলামিক বিচিত্রা ডেস্ক: মানুষের জীবনে নেমে আসা বিভিন্ন বিপর্যয়, অহংকার এবং নেয়ামত হ্রাসের পেছনে মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে মানুষের মুখনিঃসৃত কয়েকটি অহংকারসূচক শব্দ মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে। মানব ইতিহাসের তিন কুখ্যাত চরিত্র—ইবলিস, ফেরাউন এবং কারুনের পতন ঘটিয়েছিল এমন তিনটি মারাত্মক শব্দ, যা মানুষের জীবন থেকে সমস্ত বরকত ও নেয়ামত ছিনিয়ে নেয়।
১. প্রথম শব্দ: “আমি” (ইবলিসের অহংকার)
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, যখন মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের হজরত আদম (আ.)-কে সিজদা করার নির্দেশ দেন, তখন ইবলিস সেই নির্দেশ অমান্য করে অহংকারবশত বলেছিল:
“আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি থেকে।” (সূরা আল-আরাফ, আয়াত ১২)
আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার এই ছোট্ট ‘আমি’ শব্দটির কারণে ইবলিস চিরকালের জন্য আল্লাহর রহমত ও জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। মানুষের অন্তরে যখনই এই অহংকার জন্ম নেয় যে—”আমি অন্যের চেয়ে ভালো বা বেশি বুদ্ধিমান”—তখন সে মূলত ইবলিসের সেই অভিশপ্ত অহংকারেরই পুনরাবৃত্তি করে। এই মানসিকতা থেকে মুক্তির উপায় হলো আত্মম্ভরিতা ত্যাগ করে বলা: “সবই আল্লাহর তাওফিক ও দয়া।”
২. দ্বিতীয় শব্দ: “আমার” (ফেরাউনের আস্ফালন)
সমস্ত ক্ষমতার উৎস মহান আল্লাহ—এই চিরন্তন সত্যটি ভুলে গিয়ে দাম্ভিক শাসক ফেরাউন তার রাজত্ব ও প্রাচুর্য নিয়ে অহংকার প্রকাশ করে বলেছিল:
“মিডরের রাজত্ব কি আমার নয়? আর এই নদীগুলো কি আমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে না?” (সূরা আল-আরাফ / সূরা আল-যুখরুফ: ৫১)
নিজের মালিকানা ও ক্ষমতার বড়াই বোঝাতে সে বারবার ‘আমার’ শব্দটি ব্যবহার করেছিল। আর এই অহংকারই তাকে নীল নদের অতল জলে ডুবিয়ে জঘন্য মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। মানুষ যখন নিজের লব্ধ সম্পদ, বাড়ি, গাড়ি, ডিগ্রি কিংবা কোম্পানিকে নিজের নিরঙ্কুশ অর্জন ভেবে আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন সে মূলত ফেরাউনের সুরেই কথা বলে। এর বিকল্প হিসেবে স্বীকার করা উচিত: “এগুলো আমার রবের করুণা ও রিজিক।”
৩. তৃতীয় শব্দ: “আমার নিজের যোগ্যতায়” (কারুনের অহংকার)
বনি ইসরাইলের বিত্তশালী অথচ লম্পট ও অহংকারী কারুন যখন তার বিশাল ধনসম্পদের অহংকার করে বসে, তখন সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে বলেছিল:
“এসব সম্পদ তো আমি আমার নিজের জ্ঞানের (যোগ্যতার) জোরেই পেয়েছি।” (সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৭৮)
যখন তাকে সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সে তখন নিজের মেধা ও যোগ্যতার বড়াই করেছিল। ফলশ্রুতিতে, এই দাম্ভিকতার কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে এবং তার সুরম্য রাজপ্রাসাদসহ মাটির নিচে ধসিয়ে দিয়েছিলেন। জীবনের কোনো সফলতা বা অর্জনকে সম্পূর্ণ নিজের কৃতিত্ব বা যোগ্যতার ফল বলে দাবি করা মারাত্মক পতনের লক্ষণ।
কোনো ব্যক্তি জীবনে কোনো নেয়ামত বা সাফল্য অর্জনের পর যদি তার কৃতিত্ব কেবল নিজের চেষ্টা ও যোগ্যতার দিকে সম্পৃক্ত করে, তবে তার জীবন থেকে ধীরে ধীরে সেই নেয়ামত ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পক্ষান্তরে, প্রতিটি সফলতার জন্য মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং সবকিছুকে তাঁর দান বলে বিশ্বাস করার মধ্যে রয়েছে প্রকৃত শান্তি ও স্থায়িত্ব।
তাই প্রাত্যহিক জীবনে ‘আমি’, ‘আমার’ কিংবা ‘আমার যোগ্যতায়’—এই অহংকারসূচক শব্দগুলো পরিহার করে রবের দরবারে বিনম্র হওয়া একজন মুমিনের প্রধান ভূষণ। আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তর থেকে সব ধরনের অহংকার দূর করে কৃতজ্ঞচিত্ত জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমীন!



