উখিয়ায় অটোরিকশা থেকে দেড় লাখ ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধারের পর ১ লাখ ইয়াবা গায়েবের অভিযোগ

অপরাধ বিচিত্রা ডেস্ক: কক্সবাজারের উখিয়ায় এক শীর্ষ মাদককারবারিকে আটকের পর উদ্ধার করা ১ লাখ পিস ইয়াবা ও একটি পিস্তল গায়েব করে দেওয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জসহ একদল পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। তবে উদ্ধার করা ইয়াবার পরিমাণ কমিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রদান এবং অস্ত্র জব্দের বিষয়টি গোপন রাখার ঘটনায় কক্সবাজারের সীমান্ত এলাকায় চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে উখিয়ার খ্যাংখালী স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) কিবরিয়ার নেতৃত্বে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় তল্লাশি চালায় পুলিশ। এ সময় পালংখালীর শীর্ষ মাদককারবারি ও ইউনিয়ন যুবদল সদস্য ছৈয়দুল বশর ওরফে ছিছিকে আটক করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রের দাবি, আটক ব্যক্তির অটোরিকশা থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার পিস (১৫ কার্ড) ইয়াবা এবং একটি ৯ এমএম পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে ঘটনার পর উখিয়া থানা পুলিশ থেকে সরবরাহ করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উদ্ধারের পরিমাণ দেখানো হয় মাত্র ৫০ হাজার পিস ইয়াবা। বিজ্ঞপ্তিতে কোনো অস্ত্রের উল্লেখ রাখা হয়নি।
স্থানীয় অভিযোগ অনুযায়ী, জব্দের তালিকায় না ওঠা সেই ১ লাখ পিস ইয়াবা পরবর্তীতে একটি মাদক কারবারি চক্রের কাছে প্রায় ১ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া উদ্ধার হওয়া পিস্তলটি জব্দের তালিকায় না অন্তর্ভুক্ত করার বিনিময়ে আটক ব্যক্তির পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এই পুরো ঘটনার ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে এসআই কিবরিয়ার পাশাপাশি এএসআই সজিবুল ইসলাম ও কনস্টেবল মোহাম্মদ সুজনের নাম এসেছে।
উখিয়া থানা পুলিশের দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বালুখালী জোড়া ব্রিজের পশ্চিম পাশে চেকপোস্টে তল্লাশিকালে অটোরিকশা থামানোর সংকেত দিলে চালকসহ তিনজন পালানোর চেষ্টা করে। ধাওয়া করে ছৈয়দুল বশরকে আটক করা হলেও অন্য দুজন পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে অটোরিকশার চালকের আসনের নিচ থেকে পাঁচটি কার্টনে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা ও অটোরিকশাটি জব্দ দেখানো হয়।
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এই বর্ণনার সত্যতা নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তুলেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, তল্লাশির সময়েই উদ্ধারকৃত ইয়াবার পরিমাণ ছিল দেড় লাখ পিস এবং সাথে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে। স্থানীয় উপজেলা ছাত্রদল নেতা মাহবুব আহমদ শাকিল ও সংবাদকর্মী রফিক উদ্দিনসহ স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের এই ভূমিকা ও উদ্ধারকৃত ইয়াবার প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে ফেসবুকে তীব্র প্রতিবাদ প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, এসআই কিবরিয়া দীর্ঘ দিন যাবত নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ফাঁড়ি ও উখিয়ায় কর্মরত থাকার সুবাদে সীমান্তের চোরাচালান পয়েন্ট, মাদককারবারি ও নিজস্ব সোর্সদের সাথে অনৈতিক যোগাযোগ গড়ে তুলেছেন। কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা গ্রহণ ও উদ্ধার করা মাদক সরিয়ে ফেলার মাধ্যমে গ্রামে নিজের স্ত্রী ও স্বজনদের নামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট জসিম আজাদ। তিনি বলেন, “মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যদি জব্দ করা ইয়াবা গায়েব ও অস্ত্র গোপনের অভিযোগ ওঠে, তবে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি মাঠে কতটুকু প্রতিফলিত হচ্ছে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।”
অভিযোগের বিষয়ে বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কিবরিয়ার হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগের তালিকা দিয়ে বক্তব্য চাওয়া হলেও প্রথমে সাড়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেন, “এ বিষয় নিয়ে অনেক কল পাচ্ছি। আপনারা তদন্ত করে যা পান, তা লিখুন।”
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, তিনি গত চার দিন ছুটিতে ছিলেন। ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও বিভাগীয় মামলা নেওয়া হবে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. অহিদুর রহমান জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ থাকলে তা সরবরাহের আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, পুলিশ অভিযান চালালেই এ ধরনের অভিযোগ ওঠে বলে অনেক কর্মকর্তা ওই অঞ্চলে দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করেন, তবে বর্তমান অভিযোগটি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে।



