জাতীয়

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০ কূপ খননের বিষদ রোডম্যাপ প্রস্তুত

অপরাধ বিচিত্রা ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও আমদানিযোগ্য তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর উচ্চ নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ২০৩১ সালের মধ্যে মোট ১৫০টি কূপ খনন ও সংস্কার (ওয়ার্কওভার) করার একটি মহাপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ গ্রহণ করেছে সরকার। দুই ধাপে বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত এই রোডম্যাপের মূল লক্ষ্য হলো দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক অতিরিক্ত ১,৭৫২ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস নিশ্চিত করা। জাতীয় রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী এই পুরো কার্যক্রমকে দুটি ধাপে বিভক্ত করা হয়েছে:

  • প্রথম ধাপ: ২০২৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত।
  • দ্বিতীয় ধাপ: ২০২৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ১৫০টি কূপের মধ্যে ১০৪টি নতুন কূপ খনন করা হবে এবং ৪৬টি কূপে সংস্কার (ওয়ার্কওভার) চালানো হবে। ইতোমধ্যে ২৭টি প্রকল্পের আওতায় ৭৭টি কূপ এবং কোম্পানিগুলোর নিজস্ব ৪টি কূপের সংস্কারকাজে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত ৫১টি কূপের মধ্যে ৩২টির কাজ ইতোমধ্যে সফলভাবে শেষ হয়েছে। বর্তমানে মাঠে ১১টি কূপের বাস্তবায়নকাজ চলছে এবং বাকি ৮টিতে কাজ শুরুর প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া ১০টি প্রকল্পের অধীন ২৬টি কূপের জন্য অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং অবশিষ্ট ৭৩টি কূপ পর্যায়ক্রমে বোর্ডের অনুমোদনের আওতায় আনা হবে।

জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের নতুন যোগান

  • সম্পন্ন ৩২টি কূপ: ইতোমধ্যে শেষ হওয়া ৩২টি কূপ থেকে দৈনিক ২৭০.৮ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে ১৩৯.৬ এমএমসিএফডি গ্যাস প্রাথমিক পর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।
  • সাম্প্রতিক ১১টি কূপ: বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংস্কার ও খনন সম্পন্ন করা ১১টি কূপ থেকে অতিরিক্ত ৫৮.৮ এমএমসিএফডি সম্ভাবনার মধ্যে ৪১.৯ এমএমসিএফডি গ্যাস ইতোমধ্যে গ্রিডে প্রবেশ করেছে।

বর্তমানে মাঠে বাস্তবায়ন পর্যায়ে থাকা ১১টি কূপের মধ্যে বাপেক্সের অধীনে রয়েছে সুন্দলপুর দক্ষিণ-১, ভোলা উত্তর-৩, ভোলা উত্তর-৪, শাহবাজপুর উত্তর-পূর্ব-১, শ্রীকাইল ডিপ-১, মোবারকপুর ডিপ-১ ও ফেঞ্চুগঞ্জ দক্ষিণ-১; বিজিএফসিএলের অধীনে তিতাস-২৯, বাখরাবাদ-৭ ও তিতাস-৩১ ডিপ; এবং এসজিএফএলের অধীনে রশীদপুর-১৩।

গ্যাসের তীব্র সংকট ও বর্তমান সরবরাহচিত্র

কাগজে-কলমে দেশে প্রতিদিন ৫,৩০০ এমএমসিএফডি গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বাস্তবে ব্যবহার হয় ৩,৮০০ এমএমসিএফডি। অথচ দৈনিক সর্বমোট জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে মাত্র ২,৭০০ এমএমসিএফডি।

বর্তমান জোগান বিশ্লেষণ (২,৭০০ এমএমসিএফডি):

  1. আমদানিকৃত এলএনজি (FSRU): ১,১০০ এমএমসিএফডি (মোট সরবরাহের ৪১%)
  2. আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি (IOC): ৮৯০ এমএমসিএফডি (৩৩%) (শেভরন: ৮৬১ এমএমসিএফডি, ক্রিসএনার্জি: ৩০ এমএমসিএফডি)
  3. দেশীয় সরকারি কোম্পানি: ৭২৬ এমএমসিএফডি (২৬%) (বিজিএফসিএল: ৪৮০ এমএমসিএফডি, এসজিএফএল: ১৩৮ এমএমসিএফডি, বাপেক্স: ১০৮ এমএমসিএফডি)

বর্তমানে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মোট ২৬২টি কূপ খনন করা হয়েছে, যার মধ্যে ১১৯টি কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে (৭৬টি পরিচালনা করছে দেশীয় কোম্পানি এবং ৪৩টি আন্তর্জাতিক কোম্পানি)।

কোম্পানিভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা ও দ্বিতীয় ধাপের পরিকল্পনা

প্রথম ধাপে বাপেক্স ৯টি, বিজিএফসিএল ৭টি এবং এসজিএফএল ১৩টি কূপের কাজ সম্পন্ন করেছে।

দ্বিতীয় ধাপে (২০২৮-২০৩১) মোট ১০০টি কূপ (৬৯টি নতুন ও ৩১টি ওয়ার্কওভার) খননের পরিকল্পনা রয়েছে:

  • বাপেক্স: ৬৮টি কূপ (৫২টি নতুন ও ১৬টি ওয়ার্কওভার)
  • বিজিএফসিএল: ২১টি কূপ (৯টি নতুন ও ১২টি ওয়ার্কওভার)
  • এসজিএফএল: ১১টি কূপ (৮টি নতুন ও ৩টি ওয়ার্কওভার)

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, নতুন এসব কূপ থেকে উৎপাদিত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর বিপুল অর্থ ব্যয় ও নির্ভরতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সবকটি কূপ খননের গতি বাড়াতে সরকার জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button