রোবট বউ কি কখনো পারিবারিক ভালোবাসা ও অনুভূতির বিকল্প হতে পারে?
অনলাইন ডেস্ক: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি আজ মানবসভ্যতাকে এমন এক মোহনায় এনে দাঁড়টিয়েছে, যা একসময় কেবল কল্পবিজ্ঞানের উপন্যাসেই সীমাবদ্ধ ছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং হিউম্যানয়েড বা মানবসদৃশ রোবট প্রযুক্তির হাত ধরে মানুষের একাকীত্ব ঘোচানোর সঙ্গী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে আধুনিক রোবট। বিশেষ করে চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রযুক্তি জায়ান্টের তৈরি লাখ ডলার মূল্যের এসব রোবট এখন মানুষের আবেগ শনাক্ত করে কথা বলতে, হাসতে ও সাড়া দিতে সক্ষম। ঘরের কোণে এক কাপ চা বাড়িয়ে দেওয়া কিংবা ক্লান্ত স্বামীর মুখে হাসি ফোটানোর মতো নিখুঁত সেবা নিয়ে বাজারে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে তথাকথিত ‘রোবট বউ’। কিন্তু এই প্রযুক্তির ঝিলিক কি আদতে মানবীয় সম্পর্কের গভীরতা, মায়া-মমতা ও পরিবারের প্রকৃত অর্থকে প্রতিস্থাপন করতে পারে?
রোবট সঙ্গীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হিসেবে ধরা হচ্ছে তার নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ, নিখুঁত শিষ্টাচার এবং কোনো ধরনের অভিযোগ বা অভিমানহীন জীবনসঙ্গী পাওয়ার সম্ভাবনা। স্বামী-স্ত্রীর চিরচরিত তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, ছোটখাটো মান-অভিমান কিংবা পুরোনো ভুলের হিসাব এখানে অনুপস্থিত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—সংসার কি কেবল কোনো ত্রুটিহীন সার্ভিসিংয়ের নাম? একজন প্রকৃত জীবনসঙ্গী যখন স্বামীর অসুস্থতায় রাত জেগে সেবা করেন, সন্তানকে আদরে বুকে আগলে রাখেন কিংবা যৌথ পরিবারের সুখের জন্য নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছা-আহ্লাদ বিসর্জন দেন, সেই আত্মত্যাগ ও নিঃস্বার্থ অনুভূতির কোনো কৃত্রিম বিকল্প কি হতে পারে? বর্তমান প্রযুক্তির উৎকর্ষ যতই বাড়ুক না কেন, রোবটের পক্ষে মানুষের খাঁটি ভালোবাসা, দুঃখের ভাগীদার হওয়া কিংবা গভীর আত্মিক সংযোগ অনুভব করা মোটেও সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের মতো পারিবারিক মূল্যবোধ ও উষ্ণ সামাজিক বন্ধনের সংস্কৃতিতে যদি কেউ কোটি টাকা খরচ করে এমন রোবট ঘরে নিয়ে আসেন, তবে তা হয়তো সাময়িক কৌতূহল বা হাস্যরসের খোরাক জোগাবে, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী সামাজিক প্রভাব বেশ গভীর।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, সার্বক্ষণিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের ফলে ঘরের অন্দরমহলের ব্যক্তিগত কথোপকথন, পারিবারিক গোপনীয়তা এবং সংবেদনশীল তথ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে চলে যাওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। নিরাপত্তা ও প্রাইভেসির এই প্রশ্নটি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অন্যতম বড় একটি উদ্বেগের জায়গা।
প্রযুক্তি তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাবে—এটাই স্বাভাবিক। বয়স্কদের নিঃসঙ্গতা দূর করতে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের পরিচর্যায় কিংবা দৈনন্দিন ক্লান্তিকর কাজে রোবটের সাহায্য নেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু তা যেন কখনোই মানুষের ভালোবাসার পরিপূরক হয়ে না দাঁড়ায়।
পরিবার কেবল ছাদ আর চার দেওয়ালের মধ্যে একসঙ্গে বসবাস করার চুক্তি নয়; সংসার হলো রাগ, অভিমান, ক্ষমা, দায়িত্ববোধ, ত্যাগ এবং পারস্পরিক নির্ভরতার এক পবিত্র মানবিক বন্ধন। স্ত্রীর একটুখানি মিষ্টি অভিমান, স্বামীর নীরব যত্ন আর পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে ডাইনিং টেবিলে বসে সময় কাটানোর আনন্দ—এর মাঝেই লুকিয়ে আছে জীবনের আসল সৌন্দর্য।
পরিশেষে বলা যায়, প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ ও গতিশীল করুক; কিন্তু যান্ত্রিকতার ভিড়ে মানুষের হৃদয় থেকে যেন পারিবারিক মায়া-মমতা আর ভালোবাসার উষ্ণতা কেড়ে না নেয়। রোবট হয়তো ক্লান্তি দূর করার সাময়িক সঙ্গী হতে পারবে, কিন্তু তা কখনোই পরিবারের ছায়া ও রক্তের সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না।



