অন্যান্যবিশ্ব

ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরের এক নতুন রাজনৈতিক বার্তা—অধ্যাপক এম এ বার্ণিক

অপরাধ বিচিত্রা ডেক্সঃ ১. আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের নতুন সংজ্ঞা:
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এই সমঝোতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী—যার নিয়ন্ত্রণ ইরান নিজেদের হাতেই ধরে রাখার শর্ত আরোপ করেছে।
এই যুদ্ধবিরতি মূলত ইরানের প্রস্তাবিত একটি পূর্ণাঙ্গ ১০ দফা শর্তপত্রের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে, যা শুধু সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।

২. নিয়ন্ত্রিত শান্তির ১০ দফা শর্ত:
ইরান যে ১০ দফা শর্ত উপস্থাপন করেছে, তা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—তারা একটি “নিয়ন্ত্রিত শান্তি” (Controlled Peace) প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে মূল ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকবে:
(১). হরমুজ প্রণালীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ:
হরমুজ প্রণালী-এর নিরাপত্তা, নৌ চলাচল তদারকি এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে ইরানের হাতে থাকবে।
(২). টোল আরোপের অধিকার:
হরমুজ দিয়ে যাতায়াতকারী তেলবাহী জাহাজ ও বাণিজ্যিক জাহাজের উপর ইরান টোল বা ফি আরোপ করতে পারবে—এটি তাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের অংশ হিসেবে স্বীকৃত হবে।
(৩). মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আংশিক প্রত্যাহার:
ইরানের উপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে শিথিল করতে হবে, বিশেষ করে জ্বালানি ও ব্যাংকিং খাতে।
(৪). মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি হ্রাস:
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও নৌ উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।
(৫). আকাশসীমায় ইরানের পূর্ণ কর্তৃত্ব:
ইরানের আকাশসীমায় কোনো বিদেশি ড্রোন বা যুদ্ধবিমান প্রবেশ করতে পারবে না, পূর্ব অনুমতি ছাড়া।
(৬). ইরানের মিত্রদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বন্ধ:
ইরানের মিত্র রাষ্ট্র ও গোষ্ঠী (যেমন আঞ্চলিক প্রতিরোধ শক্তি) বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযান চালানো যাবে না।
(৭). পারমাণবিক কর্মসূচিতে হস্তক্ষেপ না করা:
ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচিতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা নতুন শর্ত আরোপ করা যাবে না।
(৮). যুদ্ধক্ষতিপূরণ ও পুনর্গঠন সহায়তা:
সাম্প্রতিক সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সহায়তা দিতে হবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও অবদান রাখবে।
(৯). বন্দি বিনিময় ও মানবিক করিডর:
উভয় পক্ষের বন্দিদের মুক্তি এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে নিরাপদ করিডর নিশ্চিত করতে হবে।
(১০). ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চুক্তির নিশ্চয়তা:
এই যুদ্ধবিরতির ভিত্তিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তির দিকে অগ্রসর হতে হবে, যেখানে ইরানের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান স্বীকৃত হবে।

৩.পাকিস্তানের ভূমিকায় কৌশলগত মধ্যস্থতা:
এই পুরো প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান একটি “নীরব শক্তি” হিসেবে কাজ করেছে। ইসলামাবাদ একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে, অন্যদিকে তেহরানের আস্থা অর্জন করে এই সমঝোতার সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।

৪. ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত কার্যত কৌশল না দুর্বলতা:
ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর এই সম্মতি অনেক বিশ্লেষকের কাছে একটি কৌশলগত পশ্চাদপসরণ। কারণ, ইরানের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ শর্ত মেনে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। তবে এটিকে “সময়ের বিনিময়ে স্থিতি” (Stability for Time) কৌশল হিসেবেও দেখা যায়—যেখানে তাৎক্ষণিক সংঘাত এড়িয়ে ভবিষ্যতের বড় পদক্ষেপের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

*৫. ইরানের শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে
হরমুজ * :
শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে ইরান
এই পুরো সমঝোতায় সবচেয়ে বড় বিজয় অর্জন করেছে ইরান—কারণ হরমুজ প্রণালী-এর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে তারা বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। তেলের বৈশ্বিক বাজারে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

৬. শান্তির আড়ালে শক্তির পুনর্বিন্যাস:
এই ১০ দফা শর্তপত্র শুধু একটি যুদ্ধবিরতির ভিত্তি নয়; এটি একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার রূপরেখা। ইরান এখানে একটি আঞ্চলিক শক্তি থেকে “নিয়ন্ত্রক শক্তি” হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে পিছু হটলেও, এটি হয়তো একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। ফলে এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি—শান্তির সূচনা না হয়ে, ভবিষ্যতের আরও বড় সংঘাতের পূর্বাভাসও হতে পারে।
এক কথায়, হরমুজকে কেন্দ্র করে এই সমঝোতা বিশ্ব রাজনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে—যেখানে শক্তির ভাষা আরও সূক্ষ্ম, কিন্তু প্রভাব আরও গভীর।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button