দেশ

বায়েজিদে বাগানবাড়ি দখলের অভিযোগ, দিশেহারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুক্তভোগী পরিবার

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন চক্রেসোকানন এলাকায় দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে ভোগদখলে থাকা একটি বাগানবাড়ি ও বসতভিটা জবরদখলের চেষ্টার অভিযোগ তুলে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মোঃ সেলিম প্রকাশ খোকন নামে এক ব্যক্তি। তিনি দাবি করেছেন, একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে তার পরিবারের বসতবাড়ি ও বাগানবাড়ি দখলের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের হয়রানি, ভয়ভীতি, মিথ্যা মামলা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছে। এ ঘটনায় তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পুলিশ কমিশনার, জেলা সশস্ত্র বাহিনী বোর্ড, সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ ও সুবিচারের আবেদন করেছেন।লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মোঃ সেলিম প্রকাশ খোকনের পিতা মরহুম এজাহার মিয়া ১৯৮০ সালে সরকারিভাবে খাস হিসেবে ব্যবহৃত একটি জায়গা ক্রয় করে সেখানে বসতবাড়ি নির্মাণ করেন এবং ফলজ, বনজ ও বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা রোপণ করে একটি বাগানবাড়ি গড়ে তোলেন। সেই সময় থেকে পরিবারটি ওই জায়গা ভোগদখল করে আসছে। বর্তমানে ওই সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় এক একর বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারী জানান, তার পিতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই জায়গার দেখভাল করেছেন এবং বর্তমানে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা সেখানে বসবাস করে আসছেন।অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, তপশিলভুক্ত ওই জায়গার মালিক বাংলাদেশ সরকার, যার পক্ষে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ভূমি সংক্রান্ত বিষয় তদারকি করে থাকেন। জায়গাটির আরএস খতিয়ান ও বিএস খতিয়ানের তথ্যও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে থাকার পরও সম্প্রতি একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ওই সম্পত্তি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে বলে দাবি করেছেন তিনি।মোঃ সেলিম অভিযোগ করেন, চক্রেসোকানন এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে তাকে উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা করছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা তার ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা দায়ের করে হয়রানি করছে, চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দিচ্ছে, বাগানের গাছপালা কেটে ফেলছে এবং বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে। এমনকি বাড়ির আশপাশে গিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগও করেন তিনি।অভিযোগে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন মোঃ শাজাহান মজুমদার, মোঃ ইসলাম খান, মোঃ তসলিম, মোঃ জয়, মোঃ নাসিরসহ আরও ২০ থেকে ২৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি। অভিযোগকারী দাবি করেন, এদের মধ্যে কয়েকজন স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত এবং তাদের সহযোগিতায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র জমিটি দখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।লিখিত আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে অভিযুক্তদের কয়েকজন বিপুল সংখ্যক লোকজন নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। তারা বাগানবাড়ির চারপাশে লোহার অ্যাঙ্গেল স্থাপন করে ঘিরে ফেলে এবং সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় বাগানের বিভিন্ন মূল্যবান গাছ কেটে ফেলা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।মোঃ সেলিম আরও দাবি করেন, বর্তমানে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের কিছু কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে ওই জায়গায় বিভিন্ন সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, জমি সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে গেলে এক পক্ষ তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে, আবার অন্য পক্ষ আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দেয়। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে তাকে ঘুরানো হচ্ছে এবং কোনো পক্ষই সুনির্দিষ্ট জবাব দিচ্ছে না।

অভিযোগে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের কয়েকজন কর্মকর্তার নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে চুক্তির কথা বলে জমিতে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারী। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।ভুক্তভোগী আরও জানান, জমি সংক্রান্ত বিরোধ বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। জেলা জজ আদালতে এ বিষয়ে মামলা চলমান থাকলেও আদালতের রায়ের অপেক্ষা না করে একটি মহল প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় কোনো পক্ষের জোরপূর্বক দখল প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং তা বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি অবমাননার শামিল।অভিযোগকারী বলেন, তিনি একজন অসুস্থ ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তি। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মামলা মোকাবিলা করতে গিয়ে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যরাও চরম মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বাড়ির নারী ও শিশুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। দিনের পর দিন আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে তাদের।তিনি আরও বলেন, “আমার বাবার গড়া বাগানবাড়ি রক্ষার জন্য আমি প্রশাসনের কাছে বারবার আবেদন করছি। কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর সমাধান পাইনি। আমার বাগানের অনেক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। চলাচলের পথ বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমি প্রতিবাদ করলেই হুমকি দেওয়া হয়। আমরা এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করছি।”লিখিত আবেদনে তিনি দাবি করেন, অভিযুক্তরা প্রভাব খাটিয়ে তার পরিবারকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা করছে। জমি দখলের উদ্দেশ্যে একের পর এক মামলা, ভয়ভীতি ও নানা কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে তার পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।এ ঘটনায় তিনি সিএমপি পুলিশ কমিশনারের কাছে তার ও তার পরিবারের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া সেনাবাহিনী, র‌্যাব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমেরও হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।অভিযোগের অনুলিপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সেনাসদর, চট্টগ্রাম সেনানিবাস, র‌্যাব-৭, বায়েজিদ বোস্তামী থানা, মানবাধিকার সংগঠন এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।তবে অভিযোগে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের বক্তব্য এই প্রতিবেদক সংগ্রহ করতে পারেননি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘদিনের এ জমি বিরোধ এখন একটি জটিল রূপ ধারণ করেছে। আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় উভয় পক্ষের দাবি-দাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধে প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।এদিকে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং জমি সংক্রান্ত বিরোধের সুষ্ঠু নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button