বিশ্ব বাইসাইকেল দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে রাজধানীতে বাইসাইকেল র্যালি অনুষ্ঠিত

অপরাধ বিচিত্রা ডেস্ক: অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দূষণ, যানজট, জলবায়ু বিপর্যয় ইত্যাদি বাংলাদেশের শহরগুলোর অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের প্রায় ২৪% আসে পরিবহন খাত থেকে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটর সাইকেলের উপর নির্ভরতা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা দূষণ, যানজট, দুর্ঘটনা ও জ্বালানি ব্যয়কে আরও তীব্রতর করে তুলছে। এ সকল সংকট মোকাবেলায় সাইকেল হতে পারে একটি কার্যকর, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নগর যাতায়াত মাধ্যম। আজ আজ ১১ জুন ২০২৬, (বৃহস্পতিবার) সকাল ০৭:০০ টায় বিশ্ব বাইসাইকেল দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবীইং বাংলাদেশ এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট (ডাব্লিউবিবি) যৌথভাবে একটি বর্ণাঢ্য বাইসাইকেল র্যালির আয়োজন করে । উক্ত র্যালিতে বক্তারা সরকারের কাছে নিরাপদ সাইকেল লেন এবং সমন্বিত সাইকেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা ও সাইকেলের যন্ত্রাংশের ওপর বিদ্যমান শুল্ক ও কর কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসার জোরালোভাবে আহ্বান জানান। র্যালির পাশাপাশি একটি অবস্থান কর্মসূচিরও আয়োজন করা হয়। র্যালিতে বক্তারা পরিবেশ দূষণ, জলবায়ুর বিপর্যয় রোধ এবং চলমান জ্বালানী সংকট মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে বাইসাইকেলের গুরুত্বকে তুলে ধরেন।

র্যালিটি রাজধানীর আবাহনী মাঠ থেকে জিগাতলা প্রদক্ষিণ করে পুনরায় আবাহনী খেলার মাঠের সামনে এসে শেষ হয়। র্যালিটির প্রতিপাদ্য ছিল “সাইকেল বান্ধব নগরী, জলবায়ু সহিষ্ণু ভবিষ্যৎ”। ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবীইং বাংলাদেশ এর কমিউনিকেশন অফিসার মাহামুদুল হাসান এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট এর সহকারী প্রকল্প কর্মকর্তা মো. মিঠুনের সঞ্চালনায় র্যালিতে বিভিন্ন সাইকেল ক্লাবের সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, পরিবেশবাদী সংগঠন ও প্রতিনিধিবৃন্দসহ সাধারণ নাগরিকসহ প্রায় ১২০ জন সাইক্লিস্ট অংশগ্রহণ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী বলেন, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব দিন দিন প্রকট হচ্ছে। একই সঙ্গে শহরগুলোতে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বায়ুদূষণের পরিমাণ এবং জ্বালানি সংকট। সাইকেলে যাতায়াতে কোনো কার্বন নিঃসরণ হয় না এবং প্রতি কিলোমিটার যাত্রায় কার্বন নিঃসরণ ব্যক্তিগত গাড়ির তুলনায় প্রায় ১০ গুণ কম। তিনি ব্যক্তিগত মোটরযানের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অযান্ত্রিক ও পরিবেশবান্ধব পরিবহনের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন। এক্ষেত্রে বাইসাইকেল ব্যবহার একটি কার্যকর, সাশ্রয়ী ও টেকসই সমাধান। তিনি সিটি করপোরেশন, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষের সকল পরিকল্পনায় সাইকেলবান্ধব পরিবেশকে প্রাধান্য দেয়ার আহ্বান জানান।
ধানমন্ডি কচিকণ্ঠ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, একটি গাড়ি পার্কিং করতে যে জায়গা লাগে, সেই জায়গায় প্রায় ৮ থেকে ১০টি সাইকেল রাখা সম্ভব। ফলে সাইকেলের ব্যবহার বাড়লে নগরের সড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। তিনি, স্বাস্থ্যকর নগর জীবনের জন্য সাইকেল বান্ধব নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং নিরাপদ অবকাঠামোর মাধ্যমে নগরবাসীকে সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান।
রায়ের বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক তাহাজ্জাত হোসেন বলেন, প্রতিদিনের যাতায়াতে সাইকেল চালানো শরীর চর্চা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাও একটি সহায়ক মাধ্যম। প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট সাইকেল চালানো, একজন মানুষের শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাছাড়াও বায়ুদূষণ প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে পরিবেশবান্ধব সাইকেল।
ঢাকা আইডিয়াল ক্যাডেট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এম এ মান্নান মনির বলেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মস্থলে এবং স্বল্প দুরত্বে শিক্ষার্থী এবং পথচারীদেরকে বাইসাইকেল চালাতে অনুপ্রাণিত করতে হবে। পাশাপাশি, সাইকেলের ব্যবহার বাড়াতে এর মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে সাইকেল ও এর যন্ত্রাংশের ওপর বিভিন্ন শুল্ক, কর ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি করায় সাইকেলের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এক্ষেত্রে, সাইকেলের যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ও কর হ্রাস, স্থানীয় উৎপাদনে প্রণোদনা এবং সাইকেলবান্ধব নীতিমালা গ্রহণের মাধ্যমে সাইকেলকে আরও সহজলভ্য করা প্রয়োজন।
সাইকেল লেন বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি আমিনুল ইসলাম টুব্বুস বলেন , আমরা সরাসরি কর (ট্যাক্স) দিতেও রাজি আছি, যদি সরকার সাইকেল ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপদ সাইকেল লেন, পার্কিং সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করে। নাগরিকরা সেবা পেলে তার বিনিময়ে অবদান রাখতে প্রস্তুত। এখন প্রয়োজন সাইকেলবান্ধব নগর গঠনে কার্যকর উদ্যোগ।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার নিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিন্মোক্ত সুপারিশমালা তুলে ধরেন-
· প্রধান সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড জোন এবং আবাসিক এলাকাগুলোকে সংযুক্ত করে পৃথক ও নিরাপদ সাইকেল লেন নির্মাণ করা।
· শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপদ সাইকেল পার্কিং সুবিধা নিশ্চিত করা।
· স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য এলাকাভিত্তিক সাইকেল শেয়ারিং বা ভাড়া ব্যবস্থা চালু করা এবং এর প্রচার করা।
· কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার এবং গণপরিবহণ স্টেশনে নিরাপদ সাইকেল পার্কিং স্থাপন সাইকেলের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হ্রাস করা।
· সাইকেলের দেশীয় উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পকে উৎসাহিত করতে কর-সুবিধা, সহজ ঋণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা।
উক্ত প্রোগ্রামে সহ-আয়োজক হিসেবে ছিলেন, এনভাইরনমেন্ট ক্লাব-ডিএসসিই-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রায়ের বাজার উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা আইডিয়াল ক্যাডেট স্কুল, ধানমন্ডি কচিকণ্ঠ হাই স্কুল, বেঙ্গলী মিডিয়াম হাই স্কুল, লোটাস ন্যাশনাল স্কুল, শেরে বাংলা আইডিয়াল স্কুল, বাংলাদেশ সাইকেল লেন বাস্তবায়ন পরিষদ, উত্তরা সাইকেল কমিউনিটি, সূর্য শিশির রানার্স, ইকো বাংলা ইয়ুথ অর্গানাইজেশন, ধানমন্ডি টুরিস্ট সাইক্লিস্ট, কারফ্রি সিটিস অ্যালায়েন্স।



