শাহজালাল ও শাহপরান (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব তলব

সিলেট ব্যুরো: সিলেটের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের গত সাত শ বছরের প্রচলিত ও বংশানুক্রমিক মাজার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক জনাব সারওয়ার আলম। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর দরগাহকে কেন্দ্র করে দীর্ঘকাল ধরে চলা অস্বচ্ছ আর্থিক লেনদেন ও গোষ্ঠীগত আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (১০ জুন) সকাল ১১টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে মাজার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা কমিটির সাথে এক বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে এবং পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনার আলোকে আয়োজিত এই সভায় উভয় মাজারের মোতাওয়াল্লী ও সরেকওমদের মাজারের আয়-ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট হিসাবসহ উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) জনাব মাসুদ রানার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সভায় মাজার কমিটির নেতৃবৃন্দ তাদের দৈনিক, মাসিক কিংবা বার্ষিক আয়ের কোনো নির্ভরযোগ্য রেকর্ড বা হিসাব দেখাতে সক্ষম হননি। বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে জেলা প্রশাসক জনাব সারওয়ার আলম বলেন, “হযরত শাহজালাল (রহ.) ও তাঁর ভাগ্নে হযরত শাহপরান (রহ.) এ অঞ্চলে এসেছিলেন তাওহীদের বাণী নিয়ে এবং অন্যায়-জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। তাঁরা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তির সম্পদ নন, বরং তাঁরা গোটা সিলেটবাসীর গর্ব ও আল্লাহর বিশেষ রহমত।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে এই দুই মাজারকে কেন্দ্র করে সিলেটে প্রতি সপ্তাহে অর্ধলক্ষাধিক পর্যটকের আগমন ঘটে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। অথচ মাজারের নিরাপত্তা, যানবাহনের পার্কিং এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মান অত্যন্ত নাজুক। এ অবস্থা নিরসনে জেলা প্রশাসক একটি ‘মেগা প্ল্যান’ বা মহাপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তাঁর পরিকল্পনায় রয়েছে—মাজারের মসজিদগুলোকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন বহুতল ভবনে রূপান্তর করা, যেখানে নারীদের ইবাদতের জন্য আলাদা ফ্লোর থাকবে। এছাড়াও দরগাহ মাদরাসাকে বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা এবং এর লাইব্রেরিকে বিশ্বের দুর্লভ ও দুষ্প্ৰাপ্য কিতাবসমূহের প্রধান সংগ্রহশালা বা ‘মাখজান’-এ পরিণত করার ঘোষণা দেন তিনি।
সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ এহসান উদ্দিন, মহানগর সভাপতি মাওলানা হাবীব আহমদ শিহাব, জেলা সাধারণ সম্পাদক মাওলানা জালাল উদ্দীন ভুইঁয়া, ওয়াকফ স্টেটের কর্মকর্তা, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রতিনিধি এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন সিলেটের উপ-পরিচালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
জেলা প্রশাসক কড়া নির্দেশ জারি করে বলেন, এখন থেকে মাজারের যাবতীয় আয় ও ব্যয়ের হিসাব অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে সংরক্ষণ করতে হবে এবং নিয়মিত বিরতিতে জেলা প্রশাসনের কাছে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দিতে হবে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এই সাহসী পদক্ষেপের ফলে দীর্ঘদিনের কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহলের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে এবং সাধারণ মানুষের দান-সদকার অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে।



