ক্রিকেটার নাঈমকে পিটিয়ে থানায় নেওয়ার ঘটনায় মামলা, আসামিরা অধরা; পুলিশের সোর্স গ্রেপ্তার দেখানো হলো অন্য মামলায়

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় দলের ক্রিকেটারকে হেনস্তার ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনা, তদন্তে সিএমপির তিন সদস্যের কমিটি; অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য বরখাস্ত, ওসি প্রত্যাহার
জাতীয় ক্রিকেট দলের অফ-স্পিনার নাঈম হাসানকে মারধর করে থানায় নিয়ে হেনস্তার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার কয়েকদিন পার হলেও এখনো কোনো আসামিকে সরাসরি গ্রেপ্তার করা হয়নি। তবে মামলার অন্যতম আসামি পুলিশের সোর্স সোহেল হোসেন সরকারকে আটকের পর গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে ভিন্ন একটি মামলায়। এতে মামলার অগ্রগতি, তদন্তের স্বচ্ছতা এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর শুধু ক্রীড়াঙ্গন নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটারের সঙ্গে এমন আচরণ কীভাবে ঘটল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সাধারণ মানুষ। একইসঙ্গে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাঈম হাসানের পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীরা।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার রাতে। জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসান ঢাকা থেকে একটি ফ্লাইটে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিমানবন্দর থেকে অটোরিকশাযোগে নিজ বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, নগরের এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে লালখান বাজার এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ তাদের বহনকারী অটোরিকশাকে থামার সংকেত দেয়।
পুলিশ সদস্যরা অটোরিকশার চালকের কাছে কাগজপত্র দেখতে চান। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে নাঈম হাসানকে গাড়ি থেকে নামানো হয়। এরপর তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। নাঈমের পরিবারের দাবি, খুলশী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং পুলিশের সোর্স সোহেল হোসেন সরকার লাঠি ও পাইপ দিয়ে তাকে আঘাত করেন। পরে তাকে জোরপূর্বক থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, থানায় নেওয়ার পরও নাঈম হাসানকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কর্মকর্তারা হস্তক্ষেপ করেন। তাদের উদ্যোগে পরবর্তীতে নাঈম হাসানকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার যদি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের অবস্থা কী হতে পারে, এমন প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে।
পরদিন শনিবার নাঈম হাসানের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে চট্টগ্রামের খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, কনস্টেবল রাসেল চৌধুরী এবং পুলিশের সোর্স সোহেল হোসেন সরকারকে আসামি করা হয়।
মামলা দায়েরের পর সাধারণ প্রত্যাশা ছিল দ্রুত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু কয়েকদিন পার হলেও মামলার কোনো আসামিকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। বরং মামলার আসামি সোহেল হোসেন সরকারকে ভিন্ন একটি পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সোহেল হোসেন সরকারকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে হামলা, ভাঙচুর এবং অস্ত্র-গোলাবারুদ লুটের ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গত শনিবার তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে হামলা ও অস্ত্র লুটের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সেই মামলায় ১০ থেকে ১৫ হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। সোহেলকে সেই মামলার একজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এ ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী সাব্বির আলম। তিনি বলেন, “আমরা মামলা করেছি নাঈমকে মারধর ও হেনস্তার ঘটনায়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত ওই মামলার কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এতে আমরা হতাশ। আমরা চাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হোক এবং প্রকৃত দোষীরা বিচারের মুখোমুখি হোক।”
ঘটনার পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ তাৎক্ষণিক কিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। অভিযুক্ত এসআই শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও কনস্টেবল রাসেল চৌধুরীকে খুলশী থানা থেকে প্রত্যাহার করে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। পরে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
একইসঙ্গে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমানকেও দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। যদিও তার বিরুদ্ধে সরাসরি মারধরের অভিযোগ নেই, তবে পুরো ঘটনার প্রশাসনিক দায় বিবেচনায় তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে ওসি আরিফুর রহমানকে ঘিরেও বিভিন্ন মহলে নানা অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়ে আসছে। রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা এবং বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে তার নাম উঠে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আদালতের রায় বা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত নয়।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে উপপুলিশ কমিশনার (পশ্চিম) আলমগীর হোসেনকে। কমিটির সদস্যরা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং ঘটনার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা শুরু করেছেন।
উপপুলিশ কমিশনার আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, তদন্ত কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে এবং প্রতিবেদনে যাদের দায় পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, “ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত উভয় প্রক্রিয়াই চলমান রয়েছে। তদন্তের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
এদিকে ক্রীড়াঙ্গনের অনেকেই মনে করছেন, জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এ ঘটনা দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেও জড়িত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করা একজন খেলোয়াড়ের প্রতি এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা কেবল একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ নয়; বরং এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহিতা, পেশাদারিত্ব, ক্ষমতার ব্যবহার এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, মামলার অগ্রগতি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ আইনগত ব্যবস্থা এখন জনমনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বর্তমানে ক্রীড়াঙ্গন, আইনজীবী মহল, মানবাধিকারকর্মী এবং সাধারণ মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে এই মামলার দিকে। নাঈম হাসানের পরিবারের প্রত্যাশা, প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলাটিরও দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। আরো অভিযোগ রয়েছে ভুয়া সাংবাদিক ও সোর্স বাবলু বিভিন্ন অপকর্মের স্থান থেকে টাকা উত্তোলন করে ওসির হাতে দিতেন। এই ভুয়া সাংবাদিক সোর্স বাবলু খুলশী এলাকার একজন চিহ্নিত পতিতার দালাল হিসেবে সু-পরিচিত
জাতীয় দলের এই ক্রিকেটারকে মারধর ও থানায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটনে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেই প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ।



