অন্যান্যঅপরাধঅব্যাবস্থাপনাকুমিল্লাচট্টগ্রাম বিভাগদেশবানিজ্য সংবাদবাংলাদেশ

তিন দলে মিল্লা নিমসার বাজারে দৈনিক ২০ লাখ টাকা খাচ্ছে গিল্লা

এম এ মান্নান,সিনিয়র রিপোটারঃ দেশের অন্যতম বৃহত্তম কাঁচাবাজার কুমিল্লার নিমসার। প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায় মুখর থাকা এই হাটে দৈনিক লেনদেন হয় কোটি কোটি টাকা। তবে এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের আড়ালে জেঁকে বসেছে এক ভয়ানক চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট। রাজনৈতিক আদর্শে ভিন্নতা থাকলেও চাঁদাবাজির প্রশ্নে এখানে একাকার হয়ে গেছেন বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

​অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি মাসে এই বাজার থেকে টোল ও অবৈধ দখলের নামে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যার দৈনিক অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখ টাকা।
​৯ কোটি টাকার ইজারা, নেপথ্যে ‘টোল’ আতঙ্ক
​ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বুড়িচং উপজেলার শতবছরের পুরোনো এই বাজারটি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলসহ ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্য সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৪৩৩ বাংলা সনের জন্য ঐতিহ্যবাহী এই বাজারটি ভ্যাট ও আয়করসহ মোট ৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৮ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ইজারা পেয়েছেন মোকাম ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সফিকুর রহমান ভূঁইয়া।

​তবে বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও চালকদের অভিযোগ, এই বৈধ ইজারার আড়ালে চলছে প্রকাশ্য ‘ডাকাতি’। বড় একটি ট্রাক বাজারে ঢুকলেই গুনতে হয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। ​উচ্ছেদের পরদিনই সওজের জমি পুনর্দখল
​মে মাসের শুরুতে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ মহাসড়কের পাশে এক উচ্ছেদ অভিযান চালায়। কিন্তু উচ্ছেদের রেশ কাটতে না কাটতেই সরকারি জায়গা আবারও দখল করে নিয়েছে এক সর্বদলীয় সিন্ডিকেট। এই চক্রে রয়েছেন ​আওয়ামী লীগ: বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম ফারুক, নেতা রুহুল আমিন, মারুফ, ছাত্রলীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আবু নাসের সবুজ মুন্সী এবং যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পিন্টু মুন্সী।
​বিএনপি: মোকাম ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি দুলাল এবং যুবদল নেতা আমির হোসেন।

​জামায়াত: স্থানীয় কর্মী জাকির হোসেনসহ বেশ কয়েকজন।
​সওজের এই বেদখল জায়গায় প্রতি রাতে কোটি টাকার কাঁচামাল কেনাবেচা হয়। আর সেখান থেকে ‘ভাড়া’র নামে চলে রক্তচোষা চাঁদাবাজি ​বাধ্যতামূলক ‘কমিশন’ কোনো ব্যবসায়ী সরকারি জায়গায় ৫ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করলে তাকে চাঁদা দিতে হয় ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ, বিক্রির ওপর সোজা ৮ শতাংশ কমিশন! ক্যামেরা দেখলেই এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাজার থেকে সটকে পড়েন।
​ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের আর্তনাদ: ‘চাঁদা না দিলে পণ্য খালাস অসম্ভব’​খুলনা থেকে তরমুজ বিক্রি করতে আসা জাকির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন ​”সরকারি জায়গা জেনেও এখানে প্রতি লাখ টাকার তরমুজে ৮ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হচ্ছে। আমরা দূর থেকে আসি, চাঁদা না দিয়ে ব্যবসা করার কোনো উপায় নেই।”

​একই চিত্র ধনেপাতা ও সবজি বাজারেও। ১ কেজি ধনেপাতায় বিক্রেতাকে দিতে হয় ৫ টাকা খাজনা, আর ১০০ টাকার ধনেপাতা কিনলে ক্রেতাকে দিতে হয় ১০ টাকা। টাঙ্গাইল থেকে করলা নিয়ে আসা ওসমান গনি জানান, প্রতিবার বাজারে এলেই ৪০০ টাকা টোল দিতে হয়, না দিলে পণ্য নামাতেই দেওয়া হয় না। ৮০ কেজি কচুর লতি নিয়ে আসা বরুড়ার মোহন মিয়াকে দিতে হয়েছে ১৬০ টাকা।
​খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজার থেকে পণ্য কিনে বের হওয়ার সময় বিভিন্ন পয়েন্টে গাড়িপ্রতি ২০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত আলাদা চাঁদা দিতে হয়।

​অভিযোগ অস্বীকার ও দায় এড়ানোর চেনা সুর
​অতিরিক্ত খাজনা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে ইজারাদার ও বিএনপি নেতা সফিকুর রহমান ভুঁইয়া প্রথমে যুক্তি দিয়ে বলেন, “ধনেপাতা ১০ টাকা বিক্রি করলে আমরা ২ টাকা খাজনা নিই। দাম বাড়লে খাজনা বাড়ে।” তবে লতির কেজিতে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি বলেন, “এত কিছু মোবাইলে বলা যাবে না,” এবং লাইনটি কেটে দেন।​সরকারি জায়গা দখল প্রসঙ্গে জামায়াত কর্মী জানির হোসেন বলেন, “বাজারের বেশিরভাগ দোকানই সরকারি জায়গায়। আমার দোকানও কিছুটা পড়েছে, সেখান থেকে ভাড়া তুলে চলি। তবে আমি সিন্ডিকেটে নেই।

​এদিকে, বুড়িচং উপজেলা বিএনপির সভাপতি এটিএম মিজানুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল কৃষকের বাজার থেকে কোনো খাজনা নেওয়া হবে না। অথচ এখানে প্রতিদিন কৃষকদের ওপর জুলুম হচ্ছে। সরকার চাঁদাবাজি বন্ধ করতে চাইলেও প্রশাসন আমাদের সহযোগিতা করছে না।​প্রশাসনের বক্তব্য ​চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে কুমিল্লার পুলিশ সুপার স্পষ্ট জানিয়েছেন, কুমিল্লায় কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বরদাশত করা হবে না এবং প্রশাসন শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

বুড়িচং থানার ওসি লুৎফর রহমান বলেন, “গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ভুয়া রসিদসহ ১০ চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশের কোনো সদস্য এর সাথে জড়িত নয়। আবারও অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
​সওজের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, উচ্ছেদের পর আগের দখলদাররাই আবার ফিরে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে আবারও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।

​ভোক্তাদের দাবি দেশে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে নিমসারের মতো দেশের বড় বড় মোকামগুলোর রাজনৈতিক সিন্ডিকেট সবার আগে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button